দেয়াল
প্রকাশিত: মার্চ ১৫, ২০১৮
লেখকঃ vickycherry05

 61 বার দেখা হয়েছে

এই লেখক এর আরও লেখা পড়ুনঃ vickycherry05

গল্প লেখক
khairunnesa sultana.
(মার্চ – ২০১৮)
…………

ঘুম ঘুম চোখে ব্ল্যাকবোর্ড ঝাপসা লাগছে। ক্লাসরুমে আলো আধারের খেলা চলছে বোধ হয়! চোখ কচলানো শেষ হলে বোঝা গেল যে আলো আধার না বরং স্যারের নতুন উদ্ভাবনী চিন্তার অমৃততুল্য বাণীগুলো কানে বারবার বারি খাচ্ছিলো।
স্যার : শিক্ষার্থীরা মন দিয়ে শুনবে কিন্তু, ধরো তোমাদের আমার কথা বা ক্লাসটা ভালো লাগবেনা কিন্তু তাও পড়তে হবে, মনোযোগ দিতে হবে আর এই মনোযোগ জিনিসটা বেশ চমৎকার! বুঝতে পারলে নাতো? দাড়াও ব্যখ্যায় যাচ্ছি। এই ধরো ছোট বাচ্চাদের ঘুম পাড়ানোর সময় তাদের গুনগুন করে গান শোনাতে হয় আর তারপর আস্তে আস্তে তারা ঘুমিয়ে পড়ে তাইতো? সবাই ভাবে শিশুটি আরামে ঘুমিয়েছে কিন্তু আসলে সে মনোযোগী ছিলো তাই ঘুমিয়ে পড়েছে। শিশুরা কান্নার সময় যখন কানের কাছে গুনগুন শব্দ শুনে তারা সেই শব্দে মনোযোগ দেয় আর সাথে সাথে কান্না থামিয়ে দেয় তারপর সেই গুনগুন পছন্দ হলে, তা মনোযোগ দিয়ে শুনতে থাকে, বুঝতে চেস্টা করে, আর এই বোঝাপড়ার সময় খুব বেশি মনোযোগ দিয়ে ফেলায় সে একসময় হাঁপিয়ে ওঠে। আর ক্লান্তিতে, বিরক্তিতে, প্রশান্তিতে বা যাই বলো না কেন সে ঘুমিয়ে পড়ে! তা আমার ক্লাসে তোমরা মোটামুটি মনোযোগ দিবে, ওই ব্যাকবেঞ্চের মেয়েটার মতো মনোযোগ দিবে না যাতে ক্লাসে ঘুমাতে হয়!”

এমনি সবার চোখ পিছনের সিটের ঘুমিয়ে থাকা অরুর দিকে গেল। স্যার তার থেকে চকটা ছুড়ে মারলে তা সোজা গিয়ে অরুর মাথায় লাগে। ওমনি মেয়েটার ঘুম ভেঙে গেল!
“ঘুম শেষ হলো, মা? ” স্যারের এইকথায় ক্লাসের দেওয়ালগুলো যেন ভেঙে পড়বে।
অরু শান্তভাবে বাকিটা ক্লাস চোখ কচলাতে কচলাতে শেষ করলো। “এক কাপ চা চলবে এখন”, সাদিকের এইকথায় অরুর ঘুমঘুম চোখে অবশেষে প্রশান্তির ছায়া দেখা গেল। সবাই ভার্সিটি ক্যান্টিনে গেল। কথায় বলে ভার্সিটি আজব জায়গা! এইখানে একপাশে তসবি হাতে বকধার্মিক যেমন দেখা যাবে তেমন গলা ছেড়ে গান বাজনা করে এমন দলও দেখা যাবে। আবার কোনো কোণায় দেখা যায় প্রেমিক জুটিকে! ক্যাম্পাসে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আড্ডা দেওয়া এই নওজোয়ানদের ভিন্নতা গুনতে হাতের পাচ আঙ্গুলে চাইতে কয়েক হাতের আঙ্গুল বেশি প্রয়োজন হবে তাও এই ভিন্নতা হয়তো গুনে শেষ করা যাবে না। আসলেই ভার্সিটি আজব জায়গা! আর অদ্ভুত তারুণ্যের এই ভার্সিটির জীবন!
অরু আর তার দল গানবাজনা করা, গলা ফাটিয়ে চিৎকার করা এসব নিয়ে ব্যস্ত থাকে। সৃষ্টিশীল দল। এরা জীবনটা উপভোগ করতে শিখেছে বলা যায়।

অরুর পুরো নাম অরুনীমা সাদিদ। মেয়েটার নামটাও তার মতো আলাদা। বাবা মা ঠিক করেছিলেন মেয়ে হলে অরুনীমা আর ছেলে হলে সাদিদ রাখবেন কিন্তু শেষমেষ দুটোই রাখা হলো। অবশ্য নাম নিয়ে এই রসাত্মক গল্পগুলো অরু তার দাদুর কাছ থেকে শুনেছে। অরুর বয়স যখন ছয় বছর তখন তার বাবা মা একটা ফ্লাইটে করে ঢাকা ফিরছিলেন, মাঝপথে এসে ফ্লাইটটি আকাশের বুকে হারিয়ে যায়, ফ্লাইট সংক্রান্ত আর কোনো তথ্যই কেও দিতে পারেন নি। অরুর বাবা মা বেচে আছেন নাকি তা অরু জানেনা, জানার দরকারও হয়নি তার। কারন তার দাদুর ভালোবাসায় সেই এক রাণীর মতো করে বড় হয়েছে।

অরু আজ ভার্সিটি যাবেনা। তার প্রচন্ড শরীর খারাপ লাগছে। মাথাব্যাথা, বমিভাব, ঘরের দেয়ালগুলো বারবার দুলছে মনে হতে লাগলো অরুর। সে ঘুমিয়ে পড়লো। পরদিন ভার্সিটি গিয়ে আবার সেই দুরন্ত জীবন অরুর! স্যোসাল ওয়ার্ক, বিভিন্ন ক্যাম্পেইনে সময় চলে যায় সারাদিন। আর দিনশেষে বিকালে এককাপ চা আর জমিয়ে আড্ডা। জীবনটা পার্ফেক্ট।

আজকে তৃতীয় বারের মতো অরুর দুর্বল লাগছে, জ্বরজ্বর লাগছে। দাদু বেশ দুশ্চিন্তায় পড়ে গেছেন মেয়েটাকে নিয়ে। কিন্তু অরুর ওই এক কথা যে, “আমার কিচ্ছু হয়নি, নো টেনশন! ”
ছোটবেলা থেকে যেই মেয়ে কখনো অসুস্থতার জন্য বিছানায় পড়েনি সে ইদানিং বারবারই অসুস্থ হচ্ছে। আর চেহারাতে দুর্বলতার ছাপটা ফুটে উঠছে স্পষ্ট থেকে স্পষ্টতর ভাবে। দাদুর কথায় বাধ্য হয়ে অরুকে ডাক্তারের চেম্বারে যেতে হলো। ডাক্তার বলে রক্ত পরীক্ষা করতে হবে। একথা শুনেই অরুর চিৎকার! ইনজেকশনকে যে বড্ড ভয় পায় মেয়েটা!
যাক সামান্য দিনেই এন্টিবায়োটিক ভাল কাজ করেছে। এখন অরু সুস্থ। ব্লাড রিপোর্ট নিয়ে কোনো মাথাব্যথাই আর নেই তার।

অরুর বন্ধুদের মধ্যে সাদিক বেশ চটপটে। আসর জমাতে সে অদ্বিতীয়। সাদিকের সেই এক কথা যে, “অরু তুই সাদিদ আর আমি সাদিক, আমরা সেই হারিয়ে যাওয়া দুইভাই!” যাগ্গে সে কথা। দুইসপ্তাহ পর অরু আর বন্ধুদল কক্সবাজারে গেল। সেখানে পৌছাতে কোনো সমস্যা হয়নি কিন্তু পৌছানোর কিছুক্ষন পরেই অচেতন হয়ে পড়ে অরু! সবাই হুড়াহুড়ি করে হাসপাতালে নিয়ে আসে তাকে। কয়েক ঘন্টার মধ্যেই তাকে স্পেশাল কেয়ার দিয়ে ঢাকায় নিয়ে আসা হয়। অরুর জ্ঞান তখনো ফিরেনি। সবাই দুশ্চিন্তায় আছে তাকে নিয়ে। দুশ্চিন্তার অবসান ঘটতে না ঘটতেই ডাক্তার সাহেব অরুর দাদা ও তার বন্ধুদের অরুর রোগটা সম্পর্কে জানায়। এক প্রকারের ক্যান্সার হয়েছে বলা চলে, আর অন্তিম স্টেজে এসে ধরা দিয়েছে! কান্না, যন্ত্রণা, আক্ষেপ, আক্রোশ, এক মিশ্রিত অনুভূতি বিরাজ করছে হাসপাতালে করিডোরে।

ঘন্টাখানেক পর জ্ঞান ফিরে অরুর। সে জানতে চায় তার কি হয়েছিলো। সাদিক বলে, “তুই আমি দুইভাই আর তুই আমাদের হারিয়ে যাওয়া তিন নম্বর ভাই সাবিরকে খুজতে গিয়েছিলি, তাইতো? ” সাদিক নিজের কান্না ধরে রাখতে না পেরে রুম থেকে বেরিয়ে গেল। একে একে সবাই বেড়িয়ে গেল রুম থেকে। কেউই যেন মানতে পারছেনা এই বাস্তবতা!

অরুর মনটা বেশ খারাপ, কিন্তু শরীরটা আরও বেশি খারাপ। আজকে অরুকে কেমোথেরাপির জন্য নিয়ে যাবে। সকাল থেকে অরুকে চারটা ইনজেকশন মারা হয়েছে, প্রতিবার সে কেঁদেছে! কেমোথেরাপি খুব সুখের বা সহজ কিছুনা। কিছু বিজ্ঞানী তো এই যুক্তিও দিয়েছেন যে কেমোথেরাপির অসহ্য যন্ত্রনাই ক্যান্সার রোগীর মৃত্যু ঘটায়! অরু হারে হারে সব বুঝতে পারছে, তার শরীরের প্রতিটি লোমকূপ যেন ব্যথার অনুভূতি টের পাচ্ছে, সূচ ফুটছে যেন তারা সমস্ত শরীরে! কেমোথেরাপি পর অরু সারাদিন বমি করলো, কিছু খাওয়ার রুচি নেই, এই যেন এক অদৃশ্য শাস্তি ব্যস্ততা!

আজকে সাত নম্বর কেমোথেরাপি। আজকে সকালে অরুকে তিনটা আর বিকালে আরও চারটা ইনজেকশন মারা হবে। অরু এখন আর ইনজেকশনকে ভয় পায় না! অরুর রুপ, লাবন্য, তারুন্যের ছাপ সবই যেন নিস্তেজ হয়ে গেছে। এখন সে শীর্ন দেহের, মৃতপ্রায় এক শরীর। যাকে বাঁচাতে ডাক্তারদের এওো দায়িত্ব। অরুর মাথা ভর্তি চুল আর নেই, তার সেই হাসি আর নেই

অরু জানে সে মারা যাবে, এই চিকিৎসা তাকে বাঁচাতে পারবেনা! কিন্তু দাদার মুখের দিকে দেখে অরু কিচ্ছু বলেনা, কোনো প্রতিবাদ করেনা, এত্তো যন্ত্রণায়ও ভাবে দাদুর খুশীর জন্য আর একটা বার সহ্য করে নিই না হয়!
অরুর জানে সে মারা যাবে কিন্তু তাও জীবনের প্রতি তার মায়া কমে না, তার সব ছোট ছোট জিনিসও বড় আপন লাগতে শুরু করে! আর কিছু না হোক সেদিন ভার্সিটির সেই মনোযোগের ব্যখ্যাও অরুর কাছে বড় প্রিয়! সেই চা, সেই সাদিক, সেই আড্ডা! সবকিছুই কেমন স্বপ্নের মতো ছিলো আর এখন যেন অরু চোখ খুলতে যাচ্ছে। জানে চোখ খুললেই স্বপ্ন ভেঙে যাবে তাও চোখ যে খুলতেই হবে!

অরু নিজেকে এই কয়েকদিন আর আয়নায় দেখেনি। খাবারের রুচি নেই তাই নতুন করে টিউব লাগানো হয়েছে তার হাতে। অরু ভাবে যে এইসব নিয়ে তাকে দেখতে আসলে কেমনটাই না লাগে! ও ভাবে আর হাসে। হাসতে হাসতে খুব কাঁদে! কিন্তু সেই কান্না কেউ দেখতে পায় না। অরুর ধারনা তার কান্না দেখলে তার দাদু আর বাচঁবেনা। বন্ধুরা সবাই দেখতে আসে তাকে, আর সবচেয়ে বেশি সময় কাটায় সাদিক। ও বলে, ” ওই সাদিদ তুই না ভাই আমার? আমায় ফালাই কই যাবি?” অরু বলে, “সাবিরকে খুজতে যাই”। দুইজনই হাসে আর হাসতে হাসতে সাদিক চোখের পানি মুছে!
আচ্ছা মৃত্যু এত্তো ধীর গতির কেন? আসবেই যখন তাড়াতাড়ি আসতে পারেনা? অন্তত বেঁচে থাকার ইচ্ছাটা এত্তোটা তীব্র হতো না। না হয় এত্তো কস্টের মধ্যেও ছোটোখাটো আনন্দ খুজে পেতো না! আচ্ছা আমরা যখন সুস্থ থাকি, ভালো থাকি তখন এই বুঝ কই যায় যে, একদিন মৃত্যু আসবেই!

অরু আজ অনেক অসুস্থ, তার ইন্টারনাল অর্গানের ক্যান্সার সাড়ানো সম্ভব নয়, বরং সব অর্গান ফেলিয়র হচ্ছে আস্তে আস্তে। অরু আজ মারা যাচ্ছে!
আইসিইউর বাইরে সবাই আছে। সবাই আল্লাহর কাছে দোয়া করছে। মানত, পীর ফকির, যে যেভাবে পারে সেভাবে সৃষ্টিকর্তার কাছ থেকে প্রাণভিক্ষা চাইছে অরুর জন্য।

তীব্র যন্ত্রণার পর অবশেষে অরু মারা গেল! বন্ধুদের কেউ কেউ কান্নায় ভেঙে পড়লো। কেউ কেউ পাথরের মতো শক্ত হয়ে বসে পড়লো মাটিতে। অরুর দাদা স্থির হয়ে বসে রইলেন এককোণে।

অরুর লাশটা যখন বের করা হয় তখন তারপাশে আলেয়ার লাশটাও রাখা হয়। আলেয়া ছোট্ট সাতবছরের মেয়ে! ক্যান্সারকে হারাতে না পেরে সেও অরুর সাথে গেল।

আমরা মানুষ ভুলে যাই যে, ভালোবাসা না বরং মৃত্যু অন্ধ হয়, এটা না রুপ দেখে, না বয়স, না টাকা দেখে না তারুন্য!

আর এই কথার সাক্ষী আর কেউ না দিলেও হাসপাতালের দেয়ালগুলো দিবে। একবার না বারবার দিবে!

সম্পর্কিত পোস্ট

অঘোষিত মায়া

অঘোষিত মায়া

বইয়ের প্রিভিউ ,, বই : অঘোষিত মায়া লেখক :মাহবুবা শাওলীন স্বপ্নিল . ১.প্রিয়জনের মায়ায় আটকানোর ক্ষমতা সবার থাকে না। ২.মানুষ কখনো প্রয়োজনীয় কথা অন্যদের জানাতে ভুল করে না। তবে অপ্রয়োজনীয় কথা মানুষ না জানাতে চাইলেও কীভাবে যেন কেউ না কেউ জেনে যায়। ৩. জগতে দুই ধরণের মানুষ...

আমার জামি

আমার জামি

জান্নাতুল না'ঈমা জীবনের খাতায় রোজ রোজ হাজারো গল্প জমা হয়। কিছু গল্প ব্যর্থতার,কিছু গল্প সফলতার। কিছু আনন্দের,কিছু বা হতাশার। গল্প যেমনই হোক,আমরা ইরেজার দিয়ে সেটা মুছে ফেলতে পারি না। চলার পথে ফ্ল্যাশব্যাক হয়। অতীতটা মুহূর্তেই জোনাই পরীর ডানার মতো জ্বলজ্বলিয়ে নাচতে...

ভাইয়া

ভাইয়া

ভাইয়া! আবেগের এক সিক্ত ছোঁয়া, ভালবাসার এক উদ্দীপনা, ভাইয়া! ভুলের মাঝে ভুল কে খোঁজা, আর ভালবাসার মাঝে ভাইকে খোঁজা, দুটোই এক কথা! ভুল তো ভুল ই তার মাঝে ভুল কে খোঁজা যেমন মূর্খতা বা বোকামি। ঠিক তেমনি ভালবাসার মাঝে ভাইকে খোজাও মূর্খতা! আমার কাছে ভাইয়া শব্দটাই ভালবাসার...

০ Comments

Submit a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *