দায়িত্ব
প্রকাশিত: অক্টোবর ২১, ২০১৮
লেখকঃ

 15 বার দেখা হয়েছে

এই লেখক এর আরও লেখা পড়ুনঃ

:অর্না খান

আষাঢ়ের শুরু তখন।আকাশ যেন ভেঙে পড়তে চায় মাটির বুকে।সকাল থেকেই বৃষ্টি।সাত বছরের ছোট্ট নীলিমা দাড়িয়ে আছে ড্রাইভার চাচার সাথে।জজ কোর্টের সামনে।নীলিমার বৃষ্টি ভালো লাগে না।কারন বৃষ্টি হলে মা আর তাকে খেলতে যেতে দিতে চায়না।বৃষ্টি কিছূটা থেমেছে।গুড়িগুড়ি পড়ছে তবুও।ড্রাইভার রহমান নীলিমাকে জিজ্ঞেস করলেন,
“মামুনি কিছু খাইবা?গাড়ির মধ্যে চিপস আছে খাইবা?”
নীলিমার খুব পছন্দের মানুষ রহমান চাচা।রহমান চাচা তাকে অনেক জায়গায় ঘুরতে নিয়ে যায়।যখন নীলিমার মা নীলিমাকে বকাঝকা করে নীলিমা তখন রহমান চাচার সাথে ঘুরে বেড়ায়।
নীলিমা রহমান চাচাকে বললো,”চাচা,এখন কিছুই খাবো না।আম্মু আব্বু এতোক্ষন ধরে কি করছে?”
রহমান কিছুটা বিব্রত হয়েই বললো,
“আইজগাতো ওনাগো ছাড়াছাড়ি মামুনি।সময়তো লাগবোই।”
নীলিমার মাথায় কথাটা ঢোকে না।সাত বছরের নীলিমার মাথায় ছাড়াছাড়ি কথাটা একটা ধাক্কা খায়।নীলিমা রহমান চাচার হাত ধরে বলে,
“চাচা ছাড়াছাড়ি কি করে হয়?”
রহমান বুঝতে পারে এতটুকু বাচ্চাকে ছাড়াছাড়ির কথা বলা ভুল,বুঝবে না।সে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলে,”ও তুমি বুঝবে না।এগুলো বড়দের কাজ।
নীলিমা আর কিছু জিজ্ঞেস করে না।সে মনে মনে ভাবে “বড় হলে কি আমারো ছাড়াছাড়ি হবে?”
“নীলুসোনা বাড়ি চলো”
পেছন থেকে তার বাবা তাকে কথাটি বলে।নীলিমা তার বাবাকে বেশ পছন্দ করে।বাবা রোজ রাতেই তার জন্য কিছু না কিছু নিয়ে আসেই।”বাবাকে অনেক ভালোবাসে নীলিমা।বাবা তাকে আদর করে নীলুসোনা বলে ডাকে।
নীলিমা গাড়িতে উঠে বসে।বাবা তার পাশে কিন্তু মা অন্য গাড়িতে উঠে বসে।নীলিমা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে,
“একি! মা অন্য গাড়িতে কেন?আমাদের সাথে যাবে না মা?”
নীলিমার ছোট্ট কপালে চুমু খেয়ে তার বাবা রিয়াজ সাহেব বলেন,”না সোনা।মা আজ থেকে অন্য জায়গায় থাকবে।আমি আর তুমি একসাথে থাকবো।কেন সোনা?তুমি আমার সাথে থাকতে পারবে না?”
নীলিমার মাথায় হাজার প্রশ্ন ঘোরপাক খাচ্ছে,।”মা কেন থাকবে না?তাহলে রহমান চাচা যে ছাড়াছাড়ির কথা বলেছিলো তার মানে কি মা আলাদা থাকবে?”
নীলিমা কিছুই বুঝতে না পারায় চিপস খাওয়ায় মনযোগ দিলো।
আজ নীলিমা দারুণ খুশি।তার বাবা আজ সারাদিন বাড়িতেই ছিলো।দুপুরে সে আর বাবা মিলে রান্নাও করেছে।বিকেলে রহমান চাচা,বাবা আর নীলিমা লুকোচুড়িও খেলেছে।রাতে শোবার সময় নীলিমা তার বাবার কাছেই শুয়েছে।নীলিমা তার আদুরে কন্ঠে জিজ্ঞেস করে,
“বাবা,মা কি আর কোনোদিনও ফিরবে না?”
নীলিমার বাবা কিছুটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়েই বলে,”কেন মা?তোমার কি আমার সাথে থাকতে ভালো লাগে না?
নীলিমা তার বাবার গলা জড়িয়ে বলে,”বাবা তোমাদের কি ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছে?”
রিয়াজ সাহেব কিছুটা ধাক্কা খায়।তার ছোট্ট মেয়েটা ছাড়াছাড়ি সম্পর্কে কি করে জানলো?সে নীলিমার কপালে চুমু দিয়ে বললো,”এসব কথা তোমায় কে বলেছে মা?”
নীলিমা বলে”কেন রহমান চাচা বলেছে।”
রিয়াজ সাহেব বলে,”এসব পঁচা কথা মা।এসব কিছু না,ঘুমাও।”
বারান্দায় একটার পর একটা সিগারেটের স্তুপ করে তুলছেন রিয়াজ সাহেব।প্রেম করে বিয়ে করেছিলো তিনি আর মিতু।দশ বছর সংসার করেও মিতু রিয়াজ কে ছেড়ে দিতে সংকোচ করেনি।”মেয়েটার প্রতিও কি একটু মায়া হলো না?”এসব কথা ভাবতে ভাবতে চেয়ারেই ঘুমিয়ে পড়ে রিয়াজ সাহেব।
সময়ের স্রোতে ভাসতে ভাসতে নীলিমা এখন বড় হয়েছে।স্কুল পেড়িয়ে কলেজ,কলেজ পেড়িয়ে ইউনিভার্সিটির ছাত্রী সে।এখন সে খুব ভালো করে বুঝতে পারে ছাড়াছাড়ির মানেটা।জীবনের অলিগলিতে সে বাস্তবতা শিখেছে।ভেতরে ভেতরে মায়ের অনুপস্থিতি নীলিমাকে পোড়ালেও সবার সামনে সে একজন শক্ত মেয়ে।সময় তার মতো বয়ে গেছে।মা যে বাবাকে ছেড়ে দিয়ে বিয়ে করেছিলেন তার বাল্যবন্ধুকে তা তার অজানা নয়।তবে এ নিয়ে খারাপ মন্তব্য করতে কখনোই দেখেনি নীলিমা তার বাবাকে।বাবা সবসময় নিজের দোষটাই দিয়েছেন।তিনিই নাকি নীলিমার মাকে প্রাপ্য ভালোবাসা দিতে পারেন নি।
এতকিছুর পরও মায়ের প্রতি ভালোবাসা দেখে নীলিমা রিতিমত অবাক হতো।
কি আশ্চর্য হয় এই ভালোবাসা এই কথাই ভাবতো নীলিমা।নীলিমা প্রায়ই দেখতেন তার বাবাকে রাত বেরোতে ছাদে দাঁড়িয়ে একমনে আকাশ দেখতে।এ নিয়ে কখনোই নীলিমা তার বাবাকে প্রশ্ন করেন নি।”থাক না মানুষটা নিজের মতো করে।নীলিমা মনে মনে বলতো।”
মায়ের প্রতি বাবার এতো ভালোবাসাও যখন মাকে আটকাতে পারেনি তখন থেকেই ভালোবাসার প্রতি তীব্র অনিহা নীলিমার।সে ভেবেই রাখে,না বিয়ে না প্রেম,আজীবন তার বাবার সাথেই থাকবে সে।
এই কথা নীলিমা তার বাবাকে জানালে তার বাবা হো হো করে হেসে বলেন,”নীলুসোনা কবে বড় হবে তুমি?জগৎ সংসার কবে বুঝতে শিখবে?”
নীলিমা তার বাবার কথার মানে বোঝে না।কিন্তু মনে মনে সে তার কথার ওপড়ই অনড় থাকবে এই তার ইচ্ছা।
জগৎ সংসারের নিয়ম বোঝা বড় দায়।সবার জীবনেই বসন্তের দোল লাগানো যেন আবশ্যক।ভালোবাসা যেন সবার জীবনে আসতে বাধ্য।ভার্সটির তিন ব্যাচ সিনিয়ার তমাল ভালোবাসার এক নতুন ছোঁয়া নিয়ে এসেছিলো নীলিমার জীবনে।যদিও সে প্রায় দুবছর নিজেকে আটকে রাখতে চেয়েছে কিন্তু অবশেষে ভালোবাসার কাছে সেও পরাজিত।তমালই তাকে বুঝিয়েছে হাতের পাঁচটা আঙুল এক না।
নীলিমার পরিবার আর তমালের পরিবারের সম্মতিতেই তাদের বিয়েটা হয়েছিল।নীলিমার মনে আছে তার বিদায়ের আগে তার বাবা বলেছিলেন,”নীলু মা ছেলেটা সত্যিই ভালো,তার ভালোবাসাকে সম্মান করো সারাজীবন।”
নীলিমার বিয়ের দুবছরের মাথায় তার বাবা মারা যান।নীলিমার দুনিয়া যেন অন্ধকার।তার দেখা সবথেকে ভালোমানুষটি তার জীবন থেকে নেই হয়ে গেলো।রহমান চাচা সেদিন নীলিমার হাতে একটা ডায়েরি তুলে দিয়ে বলেছিলো,”মা এইটা তোমার বাবার ঘরে পাইছি।তুমি রাইখা দাও আর সাহেব যখন নাই আমি গ্রামে ফিইরা যামু ভাবতাছি।”
নীলিমা তার বাবার ডায়েরিটা নিয়েছিলো আর রহমান চাচাকেও সাথে করে তাদের বাড়ি নিয়ে গিয়েছিলো তাদের সাথে থাকতে।
ডায়েরির পাতায় পাতায় নীলিমার বাবা লিখে রেখে গিয়েছিলেন তার যন্ত্রনার কথা।সেখানেই শেষ পাতায় লেখা ছিলো,”নীলু সোনা মায়ের প্রতি দায়িত্বে অবহেলা করো না।মা তো মা ই।”
হয়তো নীলিমার বাবা বুঝতে পেরেছিলেন তার সময় শেষের দিকে।
“নীলু মা চইলা আইছি।এই হাসপাতালেই তোমার মা ভর্তি।”রহমান চাচার কথা শুনে নীলিমা বাস্তবে ফিরে আসে।
আজ ১৭ বছর পর নীলিমা তার মাকে দেখবে।তার চোখ ছলছলে।গাড়ি থেকে নেমে তমাল আর নীলিমা রিসিপশন থেকে জেনে ৩০৫ নাম্বার বেডের দিকে পা বাড়ালো।
চোখের নীচে কালি,কাঁচাপাকা চুল,জীর্নশীর্ন এক শরীর বেডে পরে আছে।নীলিমা কেঁদে উঠলো।নীলিমাকে দেখে তার মা কষ্ট করে উঠে বললেন,”নীলু এসেছিস?একবার কাছে আয় মা।”
নীলিমা ঝাপটে ধরে তার মাকে,যেনও সাত বছরের সেই ছোট্ট নীলিমা তার মায়ের বুকে ফিরেছে।হু হু করে কেঁদে ওঠে সে।
তার মা বলেন,”তোর বাবা এলেন না?”
নীলিমা বলে”তিনি আর নেই মা।”
নীলিমার মায়ের চোখ থেকে পানি পড়ছে,দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে সে বলে,”মানুষটা বড্ড ভালো ছিলোরে মা।দোষ আমারই,আমি টাকার লোভে অন্ধ ছিলাম।”
নীলিমা বলে,”তোমার স্বামী সন্তান কোথায়?”
নীলিমার মা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলে,”জানিনা,স্বামী সন্তান এই বয়সে বৃদ্ধাশ্রমের পথ ধরিয়ে দিয়েছে।শুনেছি,ল
োকটা আরেকটা বিয়ে করেছে।হয়তো এটাই আমার নিয়তি।”
নীলিমা আর কিছু বলে না,কেবল দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে।
দুপুর দুই টা।রহমান চাচা গাড়ি চালু করেছেন।নীলিমার একপাশে তার স্বামী,আরেকপাশে মা।মা ভুল করেছেন তার শাস্তিও পেয়েছেন।এই বুড়ো বয়সে তাকে আর শাস্তি দিতে পেতে হবে না।মেয়ে হিসেবে এবার তাকে একটু শান্তি দেবার দায়িত্ব নীলিমার।
“শত হোক,শত ভুলের পরও সে আমার মা।”নীলিমা ভাবে।
আকাশের দিক মুখ করে নীলিমা মনে মনে বলে,”বাবা,তোমার নীলু তার দায়িত্বকে অবহেলা করেনি।সে তার দায়িত্ব পালন করছে।শত হলেও মা তো মা ই।”
সমাপ্ত।

সম্পর্কিত পোস্ট

পূনর্জন্ম

জুয়াইরিয়া জেসমিন অর্পি . কলেজ থেকে ফিরেই পিঠের ব্যাগটা বিছানায় ছুড়ে ফেললো অন্বেষা। তারপর পড়ার টেবিলের কাছে গিয়ে চেয়ার টেনে নিয়ে ধপ করে বসে দুই হাত দিয়ে মাথাটা চেপে ধরলো।প্রচণ্ড মেজাজ খারাপ ওর। আজ ওদের সেমিস্টার ফাইনালের রেজাল্ট দিয়েছে। একদমই ভালো করেনি সে। যদিও শুরু...

অনুভূতি

অনুভূতি

লেখা: মুন্নি রহমান চারদিকে ফজরের আজানের সুমধুর ধ্বনি ভেসে আসছে। বাইরে এখনো আবছা অন্ধকার। তড়িঘড়ি করে বিছানা ছাড়লো মালা। ঘরের কাজ সেরে বের হতে হবে ফুল কিনতে। তাড়াতাড়ি না গেলে ভালো ফুল পাওয়া যায় না আর ফুল তরতাজা না হলে কেউ কিনতে চায় না। মাথার ওপরে তপ্ত রোদ যেন...

অসাধারণ বাবা

অসাধারণ বাবা

লেখক:সাজেদ আল শাফি বাসায় আসলাম প্রায় চার মাস পর। বাবা অসুস্থ খুব।তা নাহলে হয়তো আরও পরে আসতে হতো।গাড়ি ভাড়া লাগে ছয়শো পঁচিশ টাকা।এই টাকাটা রুমমেটের কাছ থেকে ধার নিয়েছি।তার কাছে এই পর্যন্ত দশ হাজার টাকা ঋণ হয়েছে।বলি চাকরি হলেই দিয়ে দিব। পড়াশোনা শেষ করে দুই বছর...

৩ Comments

  1. বুনোহাঁস

    দারুণ একটি বিষয়বস্তু নিয়ে লিখেছেন। মুগ্ধ হয়ে পড়লাম। বানানের দিকে আরেকটু যত্নবান হওয়া দরকার। এছাড়া দাঁড়ি শেষে একটি স্পেস দিবেন।
    শুভ কামনা রইলো।

    Reply
  2. Parvej Mosharof

    সতেরো বছর মাকে না দেখে থাকতে পারে? অবাক লাগছে। গল্পে নীলুকে তার বাবার সাথে খুব সুখী বুঝা যাচ্ছে। তাহলে মা কে কি ভুল শুধরানোর সুযোগ দেওয়া হয়েছে, বরং তারা বাপ মেয়েই তো অন্যায় করেছে। যাই হোক, গল্পের বিষয়বস্তু কিন্তু দারুণ। আর কারণগুলো যুক্তিসম্মত লিখলে ভালো হতো। তবুও গল্পটা দারুন। ধন্যবাদ।

    Reply
  3. Rifat

    কারন — কারণ
    বিরামচিহ্নের পর স্পেস ব্যবহার করবেন। আর কয়েকটা শব্দেও ঠিকমতো স্পেস ব্যবহার করেননি।
    ভালো ছিল গল্পটা।
    শুভ কামনা।

    Reply

Submit a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *