চিঠি
প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারী ১৭, ২০১৮
লেখকঃ vickycherry05

 45 বার দেখা হয়েছে

এই লেখক এর আরও লেখা পড়ুনঃ vickycherry05

লেখকঃ তাহসিন আহমেদ ধ্রুব
(ফেব্রুয়ারী’১৮)
……………………

অনেকক্ষন ধরে দরজায় কড়া নড়ছে। মিথিলা তার বইগুলো টেবিলে সাজিয়ে রাখছিল। তার যেতে ভাল লাগছে না। হয়তো কোন ভিখিরি হবে। কিছুক্ষন কড়া নেড়ে তারপর চলে যাবে। কিন্তু বাইরের আগন্তক কড়া নেড়েই চলছে। ভাবখানা এমন যে, দরজা না খোলা হলে সে কড়া ছুটিয়ে নিয়ে চলে যাবে। আর কেউ এসে কড়া নাড়তে পারবে না। অগত্যা, মিথিলা গিয়ে দরজার দিকে এগিয়ে এল।
ডাকপিয়ন দাড়িয়ে আছে। সে মিথিলার হাতে একটি চিঠি দিয়ে দ্রুত চলে গেল। মিথিলা চিঠির ঠিকানা দেখে অবাক হলো। প্রতি মাসের শেষে, তাদের দাদা বাড়ি ও নানা বাড়ি থেকে দুটো চিঠি আসে। কিন্তু এই চিঠিতে তো নানা বা দাদা বাড়ির ঠিকানা দেয়া নেই। তবে কি ভুল করে তাদের বাসায় চলো আসলো? না, কারণ প্রাপকের ঠিকানা তো তাদের বাসার ঠিকানাই রয়েছে। মিথিলা খাম খুলে চিঠি পড়তে লাগলো,

২২.০৪.১৯৯৪
প্রাণপ্রিয় সোহাগ

কেমন আছো? আশা করি ভালই আছো। আমিও ভালো আছি। গত সপ্তাহে তো আমাদের এখানে প্রচুর বৃষ্টি হয়েছে। শহরেও কি বৃষ্টি হয়? নাকি সেখানে বৃষ্টির ফোঁটা পরতে পারে না। হি হি হি, এমনি বললাম। মনে আসলো তাই। তুমি ঠিকমত খাওয়া দাওয়া করোতো? তোমার চাকরির কি অবস্থা? বাসার চাকরটা ঠিক মতো রান্না করে তো? নাকি সকাল বেলা না খেয়েই অফিসে যাও? আর ছাতা কিনেছ? নাকি পলিথিন মাথায় করেই চলে যাও? ছাতা কিনে নিও, এভাবে ভিজলে অসুখ করবে। আমাদের এখানে বৃষ্টিতে ঘর থেকে বেরই হওয়া যায়না। সারাদিন আকাশ মেঘলা থাকে। দুপুরবেলাও সন্ধ্যা সন্ধ্যা মনে হয়। ওদিকে আমাদের বাবুর তো ছ’মাস পেরিয়ে গেল। এখন মাঝে মাঝে নাড়াচাড়া করে। খুব দুষ্টু হয়েছে মনে হয়। আর পায়েলটাও বড় হয়ে গিয়েছে, সারাক্ষন শুধু বাবা বাবা করে। রাতে ঘুমানোর আগে আবার ঘুম থেকে ওঠার সময়ও জিজ্ঞেস করে, বাবা কবে আসবে? ওর চুলগুলো না অনেক বড় হয়ে গিয়েছে। মেয়েটা দেখতে রাজকন্যার মতোই হয়েছে। যেমনটা তুমি সবসময় বলতা।
আমাদের সাদা গরুটার একটা ষাড় বাছুর হইছে। সারাক্ষন লাফায়, এদিক ওদিক ঘুরে বেড়ায়। বাছুরটা পায়েলের খুব ভক্ত, পায়েলকে দেখলেই দাড়িয়ে যায়। পায়েল বাছুরটাকে দুইদিন পর পর গোসল করিয়ে দেয়। মেয়েটা সারাক্ষন হাসে, আর তোমার কথা বলে। রহিমা ভাবির কাছ থেকে, পায়েলের কান আর নাক ফুটো করে এনেছি। তুমি আসার সময়, ওর জন্য নাকফুল আর কানের দুল নিয়ে এসো। খোলা কানে ওকে কেমন যেন খালি খালি লাগে। যে নূপুরটার একটা বিক্রি করে তুমি শহরে গিয়েছিলে না? সেই নূপুরজোড়ার অন্যটা আমি পায়েলকে পড়িয়ে দিয়েছি। ও খুব খুশি হয়েছে। ওটা সারাক্ষন পায়ে দিয়ে রাখে। আমাকে বলে, মা অন্যটা কোথায়? আমি বলেছি, এক পায়ে নূপুর আর অন্য পা খালি হলে তাকে বলে পায়েল। তুমি যেহেতু পায়েল তাই তোমার একটা নূপুর না থাকলেই ভাল হয়। তুমি মনে করে পায়েলের জন্য নাকফুল আর কানের দুল নিয়ে এসো কিন্তু।

আচ্ছা, তুমি কবে আসবে? তোমার তো গত সপ্তাহে আসার কথা ছিল। কিন্তু তুমি আসো নি বলে মা যারপরনাই কষ্ট পেয়েছে। মায়ের শরীরের অবস্থাও তেমন ভালো না। এখন আর বিছানা থেকে উঠতে পারেন না। পায়ের ফোঁড়াটাও অনেক বড় হয়েছে। ডাক্তার না দেখালে তো সমস্যা হবে। তুমি এসে বিপুল ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেও। মা সারাদিন বিছানায় শুয়ে শুয়ে তোমার কথা বলেন আর কাঁদেন। আমাকে প্রতিদিনই তোমার কথা জিজ্ঞেস করেন। আমি মিথ্যা করেই বলি, গত সপ্তাহেও চিঠি দিয়েছিলো। কিন্তু তুমিতো চিঠি পাঠাওনি। ওদিকে গতমাসে টাকাটাও পাঠানো হয়নি। আমি পুবের ভিটার নারিকেল আর পুকুরের ধারের সুপারিগুলো বিক্রি করে গত মাসটা চালিয়েছি। কিন্তু এ মাসে তো সেটা আর সম্ভব নয়। গত মাসের ডিপিএস এর টাকাটাও দিতে পারিনি। আর আব্বার কবরটা ভেঙ্গে গেছে। মতিনকে বলেছিলাম ঠিক করে দিতে, কিন্তু ও ৫০ টাকার নিচে কাজই করবে না। তুমি আসলে ওকে শাঁষিয়ে দিয়ে যেও। ওতো করে দেয়নি, তাই আমি আর পায়েল মিলে ভাঙ্গা অংশটা ভরাট করে দিয়েছি। বাবার কবরের চারপাশের বেড়াটাও ভেঙ্গে পড়েছে। ওটাও তো ঠিক করতে হবে। আর উঠানের ডালিম গাছটাকে বাঁশ দিয়ে ঠেকিয়ে রেখেছি। তুমি এসে ওটাকে ঠিকমত বেঁধে দিয়ে যেও। নাহলে কিন্তু পরে যাবে। রান্নাঘরটার ওপর থেকে পানি চুইয়ে পরে, তুমি এসে ওপরে একটু পলিথিন দিয়ে ঠিক করে যেও। আর আজকাল নাকি বাবুদের জন্য ভাল দুধ পাওয়া যায়। বাবুর জন্য দুই কৌটা দুধ নিয়ে এসো। মায়ের যেই ওষুধটা নাকে দিতে হয়, ওটাতো এখানে পাওয়া যায়না। তুমি নিয়ে এসো। অনেক কথা বলে ফেলেছি। আবুল ভাই চিঠির জন্য দাড়িয়ে আছে।
আজ আর নয়। তোমার প্রতি ভালবাসা রইল, ভালো থেকো তুমি। নিজের যত্ন নিও। ঠিকমত খাওয়া-দাওয়া কইরো।

ইতি
জামিলা

চিঠিটি পড়ার পর মিথিলা খুবই অবাক হলো। গ্রাম্য একটা মেয়ে এতো সুন্দর ভাষায় লিখলো কি করে? হাতের লিখাটাও সুন্দর।
জামিলা বেচারীর কথা শুনে মনে হলো, তাদের খুব কষ্ট হচ্ছে । তাই এই চিঠি তো সোহাগের কাছে পৌছাতে হবে। মিথিলা বাসা থেকে বের হয়ে, সিড়ি বেয়ে দোতলায় উঠে গেলো।

বাসার বারান্দায় বসে বাড়িওয়ালা চাচা পেপার পড়ছিলো। মিথিলাকে দেখে বললো,
— মা, কোন সমস্যা হয়েছে?
— জি একটু।
— কি হয়েছে?
— চাচা, আমাদের বাসায় এর আগে কি সোহাগ নামে কোন ভাড়াটিয়া থাকতো?
— হুম, তারা ছয়জন বন্ধু থাকতো। একজনের নাম ছিলো সোহাগ।
— চাচা, সোহাগ ভাইয়া এখন কোথায়?
— তুমি জানো না?
— না তো।
— সোহাগকে দিয়ে তোমার কি দরকার?
— একটু বলেন না চাচা।
— সে তো অনেক ঘটনা।
— চাচা, আমাকে বলুন।
— আচ্ছা, শোন। ছয়জনের সবাই চাকরি করতো। সে তো প্রায়, দুমাস আগের ঘটনা। এক শুক্রবারে তাদের মধ্যে তিনজন বাইরে ঘুরতে বেড়িয়েছিল। ফিরে আসার সময়, একটা দুর্ঘটনায় তাদের মৃত্যু হয়। দুজনের গ্রামের বাড়ি আর পরিচয় জেনে তাদের মরদেহ সেখানেই পাঠিয়ে দেয়া হয়। কিন্তু সোহাগ নামের ছেলেটির কোন পরিচয় খুজে পাওয়া যায়নি। এমনকি কোনো চিঠিপত্রও না। তাই সোহাগকে বেওয়ারিশ লাশ হিসেবে আজিমপুর কবরস্থানে মাটি দেয়া হয়েছে। পরের মাসে ওর সব বন্ধুরা বাড়ি ছেড়ে চলেও গিয়েছে। কিন্তু, তুুমি এসব জেনে কি করবে?

মিথিলা তার কথার কোন জবাব না দিয়ে, সিড়ি বেয়ে নিচের দিকে নামতে লাগলো। একফোটা অশ্রু তার গাল বেয়ে সিঁড়ির ওপর গিয়ে পরলো।

সেই একফোটা অশ্রু, একজন মা, একজন অর্ধাঙ্গীনী, একটা ছ’বছর বয়সী শিশু, পৃথিবীতে আগমনের প্রতিক্ষারত এক নবাগতের ভবিষ্যতের প্রতি ভালবাসা হিসেবে সমর্পণ করা হলো।

সম্পর্কিত পোস্ট

অঘোষিত মায়া

অঘোষিত মায়া

বইয়ের প্রিভিউ ,, বই : অঘোষিত মায়া লেখক :মাহবুবা শাওলীন স্বপ্নিল . ১.প্রিয়জনের মায়ায় আটকানোর ক্ষমতা সবার থাকে না। ২.মানুষ কখনো প্রয়োজনীয় কথা অন্যদের জানাতে ভুল করে না। তবে অপ্রয়োজনীয় কথা মানুষ না জানাতে চাইলেও কীভাবে যেন কেউ না কেউ জেনে যায়। ৩. জগতে দুই ধরণের মানুষ...

আমার জামি

আমার জামি

জান্নাতুল না'ঈমা জীবনের খাতায় রোজ রোজ হাজারো গল্প জমা হয়। কিছু গল্প ব্যর্থতার,কিছু গল্প সফলতার। কিছু আনন্দের,কিছু বা হতাশার। গল্প যেমনই হোক,আমরা ইরেজার দিয়ে সেটা মুছে ফেলতে পারি না। চলার পথে ফ্ল্যাশব্যাক হয়। অতীতটা মুহূর্তেই জোনাই পরীর ডানার মতো জ্বলজ্বলিয়ে নাচতে...

ভাইয়া

ভাইয়া

ভাইয়া! আবেগের এক সিক্ত ছোঁয়া, ভালবাসার এক উদ্দীপনা, ভাইয়া! ভুলের মাঝে ভুল কে খোঁজা, আর ভালবাসার মাঝে ভাইকে খোঁজা, দুটোই এক কথা! ভুল তো ভুল ই তার মাঝে ভুল কে খোঁজা যেমন মূর্খতা বা বোকামি। ঠিক তেমনি ভালবাসার মাঝে ভাইকে খোজাও মূর্খতা! আমার কাছে ভাইয়া শব্দটাই ভালবাসার...

০ Comments

Submit a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *