বউ যখন বক্সার
প্রকাশিত: মে ২০, ২০১৮
লেখকঃ vickycherry05

 304 বার দেখা হয়েছে

এই লেখক এর আরও লেখা পড়ুনঃ vickycherry05

লেখিকাঃ
রোকসানা রশিদ লিলি
(মে – ২০১৮)
………………

বিয়ের আগে শুনেছিলাম মেয়ে পড়াশোনার পাশাপাশি নিয়মিত খেলাধুলা করে। শুনে বেশ খুশিই হয়েছিলাম। এই মেয়ে নিশ্চয়ই আইপিএল দেখার সময় টিভির রিমোট কেড়ে নেবে না। তাছাড়া একটা সময় আমিও টুকটাক ক্রিকেট, ফুটবল খেলতাম।আমাদের বিয়েটা হয়েছিলো পারিবারের পছন্দে হুট করেই। তাই ঝিলের সাথে তেমন আলাপ হয় নি। কিন্তু যা বুঝলাম ও ঠান্ডা প্রকৃতির মেয়ে, শান্ত স্বভাব। নিজের সম্মন্ধে যেচে এসে কিছু বলতে চায় না। প্রশ্ন করে জেনে নিতে হয়। ওকে ভালোভাবে বুঝতে আমার বেশ বেগ পেতে হবে। বিয়ের পর প্রথম ধাক্কাটা খেয়েছিলাম পরদিন সকালে। ঘুম থেকে উঠে ঝিলকে কোথাও খুঁজে পেলাম না। ভয়ে আমার প্রাণ যখন অষ্ঠাগত তখন চোখ পড়লো আয়নায় ছোট্ট একটা চিরকুট আটকানো আছে। গুটিগুটি অক্ষরে লেখা “মর্নিং ওয়াকে যাচ্ছি। ফিরতে দেরী হবে না। ইচ্ছে ছিলো একসাথে যাবো। কিন্তু অনেক ডাকাডাকির পরও উঠলেন না। আপনি বরং ফ্রেশ হয়ে নিন। ফিরে একসাথে নাস্তা করবো।” চিঠিটা পেয়ে বুক থেকে একটা পাথর নামলো। ফেরার পর তেমন কিছু বলি নি যদিও রাগে গা, হাত পা কাঁপছিলো।
সেদিন বিকেলে বউকে নিয়ে শ্বশুড়বাড়ি গেলাম বেড়াতে। আগে কখন ঝিলের ঘরে আমার ঢোকা হয় নি। এই প্রথম ওর ঘরে ঢুকলাম। ঢুকে যা দেখলাম, চক্ষু চড়কগাছ হবার জন্য তাই ঢের। পুরো ঘরটা সাজানোর উপাদান একটাই। বিভিন্ন প্রতিযোগীতায় পাওয়া পুরষ্কার। স্কুল-কলেজ পর্যায় থেকে শুরু করে উপজেলা-জেলা এমনি জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত অসংখ্য মেডেল,সার্টিফিকেট আর ক্রেস্ট। বেশিরভাগ গুলোই বক্সিং খেলার জন্য। এসব দেখার পর থেকে আমার কেমন যেনো ভয় ভয় লাগছে। এতো দেখছি সাধারণ নরম-শরম বাঙ্গালি মেয়ে নয়। ভেবেছিলাম বিয়ের পর বউকে সবসময় টাইটের উপর রাখবো। কিন্তু যা মনে হচ্ছে তাতে ওর পক্ষে উল্টো আমাকে টাইটের উপর রাখা অসম্ভব কিছু নয়।সেদিন বাড়ি ফিরেছিলাম মন খারাপ করে। বারবার মনে হচ্ছিলো ভুল কাউকে জীবনের সাথে জড়ালাম নাতো। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই আমার ভুল ভেঙ্গে গেলো। ঝিলই আমার জন্য সবচেয়ে সঠিক মেয়ে। আমাদের মধ্যে বেশ ভাব জমে উঠেছিলো। আমি যখন যাই বলি বিনা তর্কে মেনে নেয়। ওর সমস্যা শুধু একটাই মাঝে মাঝেই রাত করে বাড়ি ফেরে। দু-তিন দিন পর পর নাক মুখ ফাটিয়ে আসে। এই বিষয়গুলো আমার একদমই পচ্ছন্দ না। তাছাড়া বাড়ির সামনের রাস্তাটা ভালো নয়। এসব নিয়ে ওর সাথে আমি প্রচন্ড ঝামেলা করতাম। কি এমন খেলে যে প্রতিদিনই চোট পেয়ে বাড়ি ফেরে? সেদিন কথায় কথায় বলেই ফেলাম “পরের বার আমি তোমার ম্যাচ দেখতে যাবো। কি এমন খেলো আমার দেখার দরকার আছে।” উত্তরে ও কিছুই বললো না শুধু মুচকি হেসে বললো, “পরশু ছুটিও নিও। ম্যাচ আছে।” অনেক বলেও অফিসে ছুটি মিললো না। শেষমেষ পেট ব্যাথার বাহানায় ছুটি নিলাম। ঝিল হাতে অনেকটা সময় নিয়ে বেরিয়েছিলো। যদিও তার কারণটা ভেন্যুতে তে পৌছে বুঝতে পেরেছিলাম। ওর কোচ থেকে শুরু করে বন্ধু-বান্ধব, কলিগ আমাকে দেখে ভিষণ খুশি। ঝিল বোধয় ওদের বলেছিলো আমি ওর খেলাধুলার ব্যাপারে অনেক হেল্পফুল আর প্রচন্ড কেয়ারিং। এই নিয়ে ওরা সবাই আমার অনেক প্রশংসা করছিলো। বেশ লজ্জা লাগছিলো মিথ্যে মিথ্যে প্রশংসা পেতে। মনে মনে প্রতিজ্ঞা করেছিলাম খেলতে ওকে আর বাধা দেব না। সবাই ঘুরেফিরে ঝিলের এতো প্রশংসা করছিলো যে মনে হচ্ছিলো অনেক বাড়িয়ে বাড়িয়ে বলছে। আবার কেউ কেউ তো লেডী মোহাম্মদ আলী বলে চিৎকার করছিলো। আমার ত্রিশ বছর বয়সে আমি এতোটা অবাক হই নি যতটা অবাক হয়েছিলাম ম্যাচ শুধু হবার পরে। আমার কলিজা শেষ কবে এতটা শুকিয়ে গিয়েছিল মনে নেই। চোখগুলো আরেকটু হলে বেড়িয়েই যেত। ঝিলের বিপক্ষ টিমের মেয়েটার জায়গায় নিজেকে একবার ভাবতেই গায়ে কাটা দিয়ে উঠছিলো। ঝিলের সামনে মেয়েটা দাড়াতেই পারলো না। চোখের পলকে ঝিল ম্যাচটা শেষ করে দিলো।যখন আমার আত্না যায় যায় করছে তখনই ঝিলের কোচ আমার পিঠ চাপরে বললো “বুঝলেন শুভ্র সাহেব, ঝিল রিংয়ে নামলেই আমাদের একটা ইমারজেন্সি এম্বুলেন্স রেডী রাখতে হয়।” “স্যার মেয়েটা বাচঁবে তো? আবার কোনো কেস-টেস হবে না তো ওর নামে?” আমার প্রশ্ন শুনে আশেপাশে একটা হাসির রোল পড়ে গেলো।

এরপর থেকে কখনোই ওর রাত করে বাড়ি ফেরা নিয়ে প্রশ্ন করি নি। সেদিনই বুঝে গিয়েছিলাম আর যাই হোক ওর নিরাপত্তা নিয়ে আমার না ভাবলেও চলবে। ঝিল ঘর আর বাহির কখনো গুলিয়ে ফেলে নি। বাইরে যত বড় বক্সারই হোক ঘরে আমার লাল টুক টুক বউ হয়ে থেকেছে। এদিকে প্রোমশনের বদৌলতে দিন দিন আমার কাজের চাপ বেড়েই চলেছিল। প্রায়ই বাড়ি ফিরতে রাত হতো। বাড়ির সামনের রাস্তাটা নিয়ে আমার বরাবরই একটা অনিহা ছিলো। বেশ সরু বলে গাড়িও ঢোকে না। বাধ্য হয়েই হেটে আসতে হয়। এখানে চুরি,ডাকাতি তো নিত্যদিনের ব্যাপার। কার মুখে যেনো শুনেছি কয়েক বছর আগে একটা খুনও হয়েছে। ঝিল কখনো এসব সমস্যা ফেস করেছে কিনা জানি না। কখনো কিছু বলে নি। আমার দুশ্চিন্তা হবে এমন বিষয়গুলো ও সবসময় এড়িয়ে যায়। এই রাস্তা নিয়ে আমার ভয়টা বোধয় ঝিল আচঁ করতে পেরেছিলো। তাই একদিন অসস্তিবোধ করতে করতে বলেই ফেলল “তুমি চাইলে রোজ এই রাস্তাটুকু আমি তোমাকে এগিয়ে আনতে পারি”। কথা বলতে ওর অসস্তিবোধ হবার যথেষ্ট কারণ ছিলো। এই পুরুষ শাসিত সমাজে এমন প্রস্তাব কোনো পুরুষ মেনে নেবে সে নিয়ে সন্দেহ হওয়াটাই স্বাভাবিক। হ্যা আমিও মেনে নেই নি। ভাব-ভঙ্গিতে বুঝিয়ে দিয়েছিলাম কথাটা আমার আত্নসম্মানে লেগেছে। এরপর থেকে ঝিল কখনোই এ ব্যাপারে কিছু বলে নি।
মাসখানেক পর ঝিলের দিদির বিবাহ বার্ষিকীর দাওয়াত পড়লো। বেশ ঝমকালো একটা পার্টি থ্রো করেছিলো ওরা। সময়টা অসাধারণ কেটেছে। ফিরতেও খানিকটা রাত হয়ে গিয়েছিলো। গাড়ি থেকে নামার পর মনে হলো গা ভর্তি গহনা নিয়ে ঝিলের নামা ঠিক হয় নি। বাড়ির দিকে এগুতে এগুতে ঝিল আর আমি আজকের মেন্যূর চুলচেরা বিশ্নষণ নিয়ে ব্যাস্ত। এমন সময় কিছু বোঝার আগেই পেছন থেকে আঘাতে মাটিতে মুখ থুবড়ে পড়লাম। চোখ তুলে দেখি ইতিমধ্যে ঝিলের সাথে কয়েকজনের তমুল হাতাহতি শুরু হয়ে গেছে। অন্ধকারে ঠিক কতজন ঠাহর করতে পারলাম না। লোকে বলে বিপদে পড়লে মানুষের বোধ বুদ্ধি লোপ পায়। কিন্তু আমার ক্ষেত্রে উল্টো। আমার জায়গায় অতি ভালো মানুষ হলে বউ বাচাঁতে কোমড় বেধে মাঠে নেমে পড়তো আর অতি খারাপ মানুষ হলে নিজের জীবন নিয়ে পালিয়ে যেত। আমি ভালো খারাপ কোনটাই না। জীবনও চাই, বউও চাই। এক দৌড়ে বড় রাস্তার মাথায় পুলিশ ফাড়িতে গিয়ে উঠলাম। একজনের জামা টেনে বললাম “স্যার….প্লিজ … বাচাঁন…. !ছিনতাই…! আমার স্ত্রী…..ওখানে!”আমার অবস্থা দেখে ওনাদের কিছু বোঝার বাকি ছিলো না। ততক্ষণ পর্যন্ত আমার মনোবল অটুট ছিলো। নিশ্চিত ছিলাম ডাকাতের দলটা ধরা পড়বেই। কিন্তু পর পর কয়েকটা গুলির শব্দ যেনো সব এলোমেলো করে দিলো। আর মাত্র দশ কদম এগুলেই সরু রাস্তাটা। কিন্তু মনে হচ্ছিলো দশ আলোকবর্ষেও যেনো ওখানে পৌছাতে পারবো না। শেষ পর্যন্ত ঝিল বাদে চার জন ছিনতাইকারীকে আটক করা হলো। একজন ছিনতাইকারী ইতিমধ্যে চম্পট দিয়েছে। সবার গায়েই রক্ত মাখামাখি হয়ে ছিলো, তাই বুঝতে পারছিলাম না গুলি কে খেয়েছে। পরে জানা গেলো ওগুলো ফাঁকাগুলি ছিলো। বাকি যা জখম আছে, সবই ছুরি নিয়ে কাড়াকাড়ির ফল। পুলিশ অফিসাররা ঝিলকে দেখে প্রচন্ড অবাক হচ্ছিলো। এই ঘটনা নিয়ে ওর কোনো দুঃখ নেই যত দুঃখ একজন ছিনতাইকারীকে ধরতে না পারায়, আর টানা হেচড়ায় গয়নাগুলো ছিড়ে যাতা অবস্থা হওয়ায়।বেচারিকে দেখে খুব খারাপ লাগছিলো। নখের আচড়ে হাত-মুখের চামড়া উঠে ক্ষত-বিক্ষত হয়ে গেছে। ভোরের দিকে হসপিটাল থেকে দুজনে বাড়ি ফিরে আসার সময় হঠ্যাৎ বললো
-শুভ্র শোনো…
-বলো।
-কাল থেকে আমার সাথে বক্সিং ক্লাবে যাবে।
-কেনো?
-এই রাস্তাটা ভালো না। ভাগ্য ভালো আজ আমি ছিলাম বলে তোমার কিছু হয় নি। কিন্তু কাল থেকে?
-কেনো এই রাস্তাটুকু প্রতিদিন তুমি আমাকে এগিয়ে নিতে পারবে না?
ঝিলের চোখে মুখে বিস্ময়ের স্পষ্ট ছাপ। নিজের কানকে যেনো বিশ্বাস করতে পারছে না।
-সত্যি বলছো?
-হ্যা। সত্যি। আমার আর চিন্তা কীসের? বউ যখন বক্সার!

সম্পর্কিত পোস্ট

পূনর্জন্ম

জুয়াইরিয়া জেসমিন অর্পি . কলেজ থেকে ফিরেই পিঠের ব্যাগটা বিছানায় ছুড়ে ফেললো অন্বেষা। তারপর পড়ার টেবিলের কাছে গিয়ে চেয়ার টেনে নিয়ে ধপ করে বসে দুই হাত দিয়ে মাথাটা চেপে ধরলো।প্রচণ্ড মেজাজ খারাপ ওর। আজ ওদের সেমিস্টার ফাইনালের রেজাল্ট দিয়েছে। একদমই ভালো করেনি সে। যদিও শুরু...

অনুভূতি

অনুভূতি

লেখা: মুন্নি রহমান চারদিকে ফজরের আজানের সুমধুর ধ্বনি ভেসে আসছে। বাইরে এখনো আবছা অন্ধকার। তড়িঘড়ি করে বিছানা ছাড়লো মালা। ঘরের কাজ সেরে বের হতে হবে ফুল কিনতে। তাড়াতাড়ি না গেলে ভালো ফুল পাওয়া যায় না আর ফুল তরতাজা না হলে কেউ কিনতে চায় না। মাথার ওপরে তপ্ত রোদ যেন...

অসাধারণ বাবা

অসাধারণ বাবা

লেখক:সাজেদ আল শাফি বাসায় আসলাম প্রায় চার মাস পর। বাবা অসুস্থ খুব।তা নাহলে হয়তো আরও পরে আসতে হতো।গাড়ি ভাড়া লাগে ছয়শো পঁচিশ টাকা।এই টাকাটা রুমমেটের কাছ থেকে ধার নিয়েছি।তার কাছে এই পর্যন্ত দশ হাজার টাকা ঋণ হয়েছে।বলি চাকরি হলেই দিয়ে দিব। পড়াশোনা শেষ করে দুই বছর...

০ Comments

Submit a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *