বিধান
প্রকাশিত: জানুয়ারী ৮, ২০১৯
লেখকঃ

 91 বার দেখা হয়েছে

এই লেখক এর আরও লেখা পড়ুনঃ

লেখকঃ ‘মুহাম্মাদ আরজু’
.
‘আহা।করতাসেন কী?এত্তানি বাচ্চারে কেউ এমনে মারে?’
কথাটা বলেই সুধিরাম মিয়া নিতাই বাবুর হাত থেকে গাছের ডালটা ছিনিয়ে নিলেন।নিতাই বাবু রাগে কঠিন গলায় বললেন,
‘মারবো না তো কী করবো?শুয়োরের বাচ্চারে কইছি চুরি করবি না।ব্যবসার জিনিস চুরি হইলে বরকত থাকে না।আজকে লইয়া তিনদিন চুরি কইরা ফালাইছে।ওরে আজ আর আমি ছাড়ুম না।’
নিতাই বাবু বাচ্চাটার দিকে আবার তেড়ে যেতেই সুধিরাম মিয়া তাকে থামিয়ে দিয়ে জিজ্ঞাস করে,
‘কী চুরি করছে?আপনের ভাতের হোটেলে তো আর স্বর্ণরূপা নাই যে চুরি করবো।’
‘বেশি কথা কও মিয়াঁ।বাংলাদেশে খাওন কি স্বর্ণরূপা থাইকা কম নি।রুই মাছ আর ভাত চুরি কইরা খাইসে।ওইদিনও খাইছিলো ছাইড়া দিসি,আজ ছাড়ুম না।’
কথাটা শুনেই সুধিরাম মিয়াঁ বাচ্চাটার দিকে মুখ করে তাকালো।কত আর বয়স হবে ৭-৮।এই বয়সের বাচ্চা পোলাপান কত কিছুর জন্য বায়না ধরে আর এই ছেলেটা ভাত চুরি করে খায়।আহা!কী কষ্ট কী কষ্ট।
সুধিরাম মিয়াঁ নিতাই বাবুর দিকে তাকিয়ে বলে,
‘মারলে কি আপনের খাওন ফিরত পাইবেন নি।ছাইড়া দেন।’
নিতাই বাবু চেহারায় রাজ্যের অন্ধকার নামিয়ে বলে,
‘তোমার এত দরদ লাগলে টেকা দিয়া ছাড়ায় লইয়া যাও,নয়তো এত কথা কইয়ো না।’
‘হ আমিই দিমু।কন কত টেকা হইসে?’
নিতাই বাবু চমকে গিয়ে বললেন,
‘স্বভাব খারাপ করার কথা।দিতে যখন চাইছো তাইলে রুই মাছ ৪০ আর ভাত দুই প্লেট ২০,মোট ৬০ টেকা দেও।’
সুধিরাম মিয়াঁ চটজলদি লুঙ্গির গিঁট খুলে ৬০ টাকা বের করে নিতাই বাবুর হাতে দিলো।তারপর বড়ই গাছ থেকে বাচ্চাটার বাঁধন খুলে বাচ্চাটাকে মুক্ত করে নিতাই বাবুর সামনে নিয়ে আসলো।নিতাই বাবু কিছু একটা বলতে যাবে এমন সময় সুধিরাম মিয়াঁ বলে উঠলো,
‘টেকার লাইগা ধর্মকর্ম ভুইলা গেলে চলে না বাবু।ক্ষুধার্ত মানুষরে খাওয়ানের মতো পূর্ণ্যের কাম আর হয় না এইডা জানেন না?’
‘এত ধর্মকর্ম দেখাইয়ো না।টেকার লাইগা সব করতে হয়।এই ভাত আর মাছ আমারে ২০ টেকা লাভ দিতো।এই টেকা দেওয়ার কেউ নাই।’
কথাটা বলেই নিতাই বাবু রাগে গরগর করতে করতে তার হোটেলে ফিরত গেলেন।
বাচ্চাটা অপলক দৃষ্টিতে সুধিরাম মিয়াঁর দিকে চাইলো।কি নিষ্পাপ চাহনি,যেনো আস্ত একটা দেবশিশু।অথচ এই চাহনির ভিতর রাজ্যের ক্ষুধা বাস করছে।বাচ্চাটা পিছে ফিরে চাইলো,সুধিরাম মিয়াঁও পিছে ফিরলো।বড়ই গাছের নিচে ভাতগুলো ছড়ানো।একটা কাক হঠাৎ উড়ে এসে ভাতের উপর ঠোকর বসাতে শুরু করলো।সুধিরাম মিয়াঁর মনে হলো এই রাজ্যের সবাই ক্ষুধার্ত।ক্ষুধা নিয়ে পাখি উড়তে পারে,মানুষ হাটতেও পারে না।
বাচ্চাটার শরীরে জামা নেই শুধু একটা হাফপ্যান্ট পরা। শরীরের অনেক অংশ ফুলে গেছে।সুধিরামের দেখে মায়া লেগে গেলো।দেশ তো অনেক উন্নত হয়ে গেছে তবুও ক্যানো আজ মানুষের ভাত চুরি করে খেতে হবে?
সুধিরাম মিয়াঁ বাচ্চাটার দিকে তাকিয়ে হাসতে হাসতে জিজ্ঞাস করে,
‘কিরে বেটা,ভাত চুরি করলি ক্যান?তোর বাপ-মা কই?নাকি বাসায় রান্ধে নাই?’
বাচ্চাটা কয়েক পলক ফেলে বললো,
‘বাপ মইরা গেছে আর মায় কই জানি গেছে গা।দুইদিন ধইরা ভাত খাই না,হেল্লিগা চুরি করছি।’
সুধিরাম মিয়াঁর মনটা ব্যথিত হলো।এতখানি একটা বাচ্চা দুইদিন ধরে ভাত খেতে পায় না।বাবা-মায়ের ছায়া মাথায় নেই,যেনো নিজের ছোটবেলার কাহিনী আবার শুনতে পেলো।কত কষ্টই না করেছিলো ভাতের জন্য।বাবা-মা ছাড়া সুধিরাম কত দরজায় না ভাতের জন্য গিয়েছিলো।
বাঙালির জন্য ভাতের কষ্ট হলো সবচেয়ে বড় কষ্ট।কষ্টের মাত্রা তীব্র হতেই তা চোখে ভেসে উঠতে শুরু করলো।সুধিরাম নিজের চোখের পানি সামলে নিয়ে বললো,
‘আমার লগে যাবি?আইজ থাইকা তুই আমার লগে থাকিস ভাতের কষ্ট পাবি না।যাবি?’
বাচ্চাটা মাথা নেড়ে সম্মতি জানালো।সুধিরাম মিয়াঁ মুচকি হেসে হাটতে শুরু করলো।১৫০ টাকা নিয়ে বাজারে এসেছিলো।সুধিরাম মিয়াঁ আর তার স্ত্রী শ্যামা ছাড়া পরিবারে আর কেউই নেই।১৯ বছরের সংসার কিন্তু বাচ্চাকাচ্চা হয় নি।দুইজনের সংসারের জন্য ১৫০ টাকার বাজার অনেক।কিন্তু এখন হাতে আছে ৯০ টাকা,চালের দাম ৪০-৪৫ টাকা আর সবজির দামও এখন বেশি।আজ ভালো কিছু খাওয়া যাবে না।এতে তার মনে কোনো দুঃখ নেই।একটা ক্ষুধার্ত মানুষকে খাওয়ানোর আনন্দের চাইতে বড় আনন্দ আর কী হতে পারে?
চাল,ডিম,আলু,পেঁয়াজ নিয়ে সুধিরাম মিয়াঁ বাড়ি ফিরেন।তার স্ত্রী বাচ্চাটাকে দেখে জিজ্ঞাস করেন,
‘এইডা আবার কারে লইয়া আইলা?’
সুধিরাম মিয়াঁ ঘরের খাটে বসতে বসতে বললো,
‘ছোড মানুষ,ভাতের কষ্টে ভাত চুরি কইরা খায়।বাপ মা নাই।আইজ থাইকা আমগো লগে থাকবো।’
‘কি দুইদিন পর পর একেকটা কাহিনী করো।এইসব আর ভাল্লাগেনা।’
সুধিরাম মিয়াঁ বাচ্চাটাকে উদ্দেশ্য করে বললো,
‘উঠানে কল আছে।পানি দিয়া হাতমুখ ধুইয়া আয় তোরে কিছু খাইতে দেই।’
বাচ্চাটা ঘর থেকে বের হতেই শ্যামা চেঁচিয়ে বললো,
‘খাওন কইত্তে দিবো?ঘরে খাওন থাকা লাগবো না?’
সুধিরাম সিগারেট ধরিয়ে বললো,
‘কিছুই নাই?সকালে না কতগুলা খাওন দেখলাম।’
‘ওইগুলা সব ভোগে চড়াইছি।’
সুধিরাম সিগারেটে একটা লম্বা টান দিয়ে বললো,
‘যা গিয়া নিয়া আয়।’
শ্যামা চমকে গিয়ে বললো,
‘এইডি কি কইতাছো?ভগবানের ভোগ সরায় নিবা?ভস্ম হইয়া যাইবা তো।বুদ্ধিশুদ্ধি কি সব ভাতের লগে খাইয়া উঠলা নি?’
‘বুদ্ধি আছে বইলাই এই কথা কইলাম।প্রতিবার ভোগ দেস আর প্রতিবার বিলাই খাইয়া উঠে।তুই মনে করোছ ভগবান খাইয়া উঠছে।ভগবানের কি ক্ষিধা আছে নি?ক্ষিধা আছে মানুষের আর জীব-জন্তুর।দেখোছ না ক্ষিধার জ্বালায় মানুষ ভাত চুরি করে।ভগবানরে দেখসোত কখনো ক্ষিধার জ্বালায় খাওন চুরি করতে?’
সুধিরামের এমন লম্বা চওড়া ভাষণ শুনে শ্যামা তার ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত পেলো।বাচ্চাটার জন্য তার মনে ভীষণ ক্ষোভের জন্ম নিলো।
ঘরের ভিতরই একটা ছোট জায়গায় শ্রীকৃষ্ণের মূর্তি রেখে সেখানটা আলাদা করে রাখা।শ্যামা সেখান থেকে ভোগ এনে দিলো।বাচ্চাটাকে খাটের উপর বসিয়ে সুধিরাম তাকে খেতে দিলো।ছেলেটা খাবার পেয়ে চটজলদি খেতে শুরু করলো।সুধিরাম এক ধ্যানে ছেলেটার দিকে চেয়ে থাকলো।শ্যামা দূর থেকে কঠিন দৃষ্টিতে ছেলেটাকে পরখ করতে থাকলো আর মনে মনে বলতে থাকলো ‘ভগবান নাদানের ভুল ক্ষমা কইরো।’
সুধিরাম ছেলেটার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছিলো।বাচ্চাটার রূপ নেই তবুও এই মুহূর্তে তাকে খুব সুন্দর লাগছিলো।সুধিরাম
ের মনে হচ্ছিলো যেনো স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণ তার সামনে বসে খাবার খাচ্ছে।কিন্তু এসবের কিছুই শ্যামাকে ভাবাচ্ছে না।শ্যামা শুধু চিন্তা করছে যে করেই হোক এই ছেলেটাকে বের করে দিতে হবে নয়তো আরো সমস্যা হবে।সুধিরামের চোখে পানি জমাট বাধলো,ছোটবেলা ঠিক এভাবেই সে ভাত পেলে দেবতার জন্য দেওয়া প্রসাদের মতো খেতো।সে তার ছোটবেলার প্রতিচ্ছবি দেখতে পাচ্ছে এটা আনন্দের নাকি দুঃখের তা বুঝে উঠতে পারলো না।
সুধিরাম ছেলেটার দিক থেকে চোখ সরাতেই চোখের পানি টুপ করে পড়লো।শ্যামা কিছু বুঝে উঠতে না পেরে জিজ্ঞাস করলো,
‘কান্দো ক্যান?’
চোখ মুছতে মুছতে জবাব দিলো,
‘কিছু না।ছোড বেলার কথা মনে পইড়া গেলো।দেখ পোলাডারে,মনে হইতাসে ভগবান ওর ভিতরে ঢুইকা গেসে।একদম কৃষ্ণের মতো লাগতাসে।’
শ্যামা ভ্রু-কুঁচকে বললো,
‘উহ।ঢংয়ের জায়গা পাও না।এই পোলার নাম কি?’
সুধিরাম ছেলেটাকে জিজ্ঞাস করতেই সে জবাব দিলো,
‘আমার নাম হোসাইন।নবীর নাতি হোসাইন।’
শ্যামা চোখ বড় করে বলতে লাগলো,
‘কি সর্বনাশ হইয়া গেলো।ভগবানের খাওন একটা মুসলমানের বাচ্চা খাইয়া ফেললো।এই পাপ তুমি আমারে দিয়া করাইলা?’
হোসাইন শ্যামার দিকে চেয়ে রইলো।সুধিরাম শ্যামাকে ধমকের স্বরে বললো,
‘আহা।কি চিল্লাফাল্লা শুরু করলি।খাওনের কোনো জাত নাই।জাত হইলো মানুষের।মানুষের লাইগা খাওন,ভগবানের লাইগা না।’
শ্যামা চুপসে গেলো ঠিকই কিন্তু ছেলেটার প্রতি সে বিদ্বেষী হয়ে উঠলো।এখন এক মুহূর্তের জন্য ছেলেটাকে তার সহ্য হচ্ছে না।মন চাইছে কালীপূজায় পাঠার বদলে একেই বলি দিয়ে দিতে।
দুর্গাপূজা শুরু হয়ে গেলো।এতদিন হোসাইনকে সুধিরাম খুব আদর যত্নে পালন করতে থাকলো কিন্তু শ্যামার কাছে হোসাইন গলার কাটার মতো যন্ত্রণাদায়ক মনে হলো।দুর্গাপূজার উৎসবে বাঙালি হিন্দুরা সাধারণত ভালো-মন্দ খাবার খায়,নতুন কাপড় পায়।হোসাইনকেও দামী একটা পাঞ্জাবি দেওয়া হলো তারপর সে কি খেতে চায় সুধিরাম তাকে জিজ্ঞাস করলো,
‘ও হোসাইন।ভালা-মন্দ কিছু খাইতে মনে চায়?খাইতে মন চাইলে বল আমারে,খাওয়ামু।’
হোসাইন সরল মনে বললো,
‘গরুর গোশত খাইতে মনে চায়।আব্বা একবার ঈদে খাওয়াইসিলো,তারপর আর খাই নাই।’
সুধিরাম হাসিমুখে বললো,
‘আইচ্ছা খাওয়ামু নে।’
এই কথা শুনেই শ্যামা চিৎকার দিয়ে বললো,
‘হায় ভগবান!কি অধর্মের কথা কয় এগুলা।পাপের পুঁটলি আইয়া পড়ছে আমার ঘরে।বাইর হ এই ঘর থাইকা।ওরে ঘর থাইকা বাইর করো নয়তো আমিই বাইর হইয়া যামু।’
সুধিরাম বিরক্তবোধ করে বললো,
‘কি ব্যাপার ক তো?এত ধর্ম যে করলি জীবনে কিছু পাইসোত?সব জিনিসে পাপ খোঁজ করোছ।গরুর গোশত খাওয়া মুসলমানগো লাইগা খাওয়া পাপ না।তোরে তো আর খাইতে কয় নাই।’
শ্যামা রাগে অগ্নিশর্মা হয়ে বললো,
‘এই ঘরে যদি এই পাপী জিনিস ঢুকে তাইলে আমি ঘর ছাইড়া চইলা যামু।পাপীষ্ঠ ঘরে আমি থাকুম না।’
‘চইলা যা।তোরে ধইরা রাখছে কে?’
শ্যামা কষ্টে জর্জরিত কণ্ঠে বললো,
‘এই পাপীর লাইগা তুমি আমারে যাইতে কইতাসো?১৯ বছরের সংসার ওর লাইগা ভাইঙ্গা দিতো চাও?’
‘আমি কিছুই চাই না।তুই হুদা কথা বাড়াইতাসোত।’
শ্যামা ততক্ষণাত ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেলো।সুধিরাম শ্যামাকে বাধা দিলো না।সুধিরাম জানে সন্ধ্যার দিকেই আবার শ্যামা ফিরে আসবে কারণ শ্যামার আপন বলতে সুধিরামই আছে।
সন্ধ্যার দিকে শ্যামা বাড়ি ফিরলো কিন্তু সুধিরামের সাথে কোনো কথা বললো না।পূজার স্থানে সারাক্ষণ মাথা ঠেকিয়ে কান্না করে ভগবানের কাছে আরজ করলো যাতে ঘরে গোশত না আসে।সুধিরাম শ্যামার বাড়ি ফিরা দেখে মুচকি হেসে হোসাইনকে বললো,
‘চল বেটা দূর্গা মাকে দেইখা আহি।’
হোসাইন যেতে রাজি হলো।সুধিরাম হোসাইনকে নিয়ে পূর্বপাড়ার মণ্ডপে গেলো।মণ্ডপকে কেন্দ্র করে একটা মেলার মতো আয়োজন হয়েছিলো।হোসাইন সেখানে অনেক আনন্দ করলো।
শ্যামার প্রার্থনা কোনো কাজে আসলো না।পরেরদিন সুধিরাম গরুর গোশত কিনে নিয়ে আসলো।গরুর গোশত দেখে শ্যামার মন অনেক ব্যথিত হলো।হোসাইন শ্যামার কাছে বিষফোঁড়ার মতো যন্ত্রণাদায়ক মনে হলো।কাঁদতে কাঁদতে শ্যামা মনে পণ করলো যে করেই হোক হোসাইনকে ঘরছাড়া করতেই হবে।কিন্তু সুধিরাম হোসাইনকে চোখে চোখে রাখে।কীভাবে বের করবে এটা শ্যামা ভেবে পাচ্ছিলো না।
শীতকালের একদিনে সুধিরাম গঞ্জের কাজ সেরে সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরতেই লক্ষ করলেন ঘরে হোসাইন নেই।সুধিরামের বুক ধুক করে উঠলো।মনে হলো কিছু একটা খারাপ হয়েছে।সুধিরাম ব্যাকুল হয়ে শ্যামাকে জিজ্ঞাস করলো,
‘পোলাডা কই?’
শ্যামা বিরক্তি নিয়ে বললো,
‘কে জানে।আমি কি কামলা নাকি যে ওয় কই যায় কি করে খবর রাখুম।’
সুধিরাম শ্যামার চোখে চোখ রাখতেই শ্যামা চোখ সরিয়ে নেয়।সুধিরাম বুঝে ফেলে শ্যামা মিথ্যা বলছে।সুধিরাম গলা ভার করে জিজ্ঞাস করে,
‘শ্যামা সত্যি কইরা ক পোলাডায় কই?’
শ্যামা ঘর থেকে বের হতে হতে বলে,
‘মিছা কথা কইয়া লাভ কি?কই গেছে জানি না।আর তোমারও এত ভাইবা লাভ নাই।নিজের জীবন নিজে বুইঝা লউক।’
সুধিরাম শ্যামার পিছে পিছে গিয়ে বাড়ির উঠানে আসতেই হাত টান দিয়ে মুখোমুখি করায়।তারপর হাত চেপে কঠিন স্বরে বলে,
‘সত্য কইরা ক পোলাডায় গেছে কই?তোরে ভগবানের কিরা লাগে।’
শ্যামা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে তারপর মুখ ভার করে বলে,
‘বাইর কইরা দিসি।এই পাপীর লাইগা সংসারে ভগবান মুখ কইরা চায় না।অশান্তি লাইগাই থাকে।আর ওর লাইগা তুমিও অধর্ম করা শুরু করছো,এইডা আমি মাইনা নিমু ক্যামনে?’
সুধিরামের চোখ বড় হয়ে যায়।হোসাইনকে বাড়িছাড়া করেছে শুনে অন্তরটা কেঁপে উঠে।
সুধিরাম চোখেমুখে শক্তভাব নিয়ে এসে কঠিন গলায় বলে,
‘তুই কি ধর্মের ঠিকাদারি নিসোত?নাকি ভগবান তোরে কানে কানে কইছে মুসলমান পোলাপান ঘরে থাকলে পাপ হয়?তোর মনে কি দয়ামায়া নাই?ছোড একটা বাচ্চারে এই শীতের রাইতে বাইর কইরা দিতে অন্তর কাঁপলো না?ক্যামনে পারলি তুই এই কামডা করতে।’
শ্যামা সুধিরামের কথা তোয়াক্কা না করে বললো,
‘যা করছি ভালা করছি।তোমার এত দরদ দেখান লাগবো না।’
সুধিরাম ভৎসনার স্বরে বললো,
‘তোর বুকে মায়াদয়া নাই।এই কারণেই ভগবান তোর কোলে সন্তান দেয় নাই।তুই মা হওয়ার যোগ্য না।’
কথাটা শুনে মুহূর্তেই শ্যামার চোখে পানি এসে পড়লো।সুধিরাম দীর্ঘনিশ্বাস ফেলতে ফেলতে বললো,
‘কাইন্দা লাভ নাই।পোলাডারে কষ্ট দিয়া তুই ভালা কাজ করোছ না।এই পাপ ভগবান ক্ষমা করবো না।’
শ্যামা কাঁদতে শুরু করে দিলো।নিরব কান্না।সুধিরাম হোসাইনকে খুঁজতে বাড়ি থেকে বের হয়ে যায়।
প্রথমে গেলো নিতাই বাবুর হোটেলে,সেখান থেকে পুরো বাজার ঘুরে না পেয়ে আশাহত হয়ে বাড়ি ফিরলেন।সংসার জীবনের এই পর্যায়ে এসে সুধিরামের মনে চাইলো শ্যামাকে প্রহার করবে কিন্তু মন সায় দিলো না।
দুইদিন পর ভোরের দিকে হোসাইনকে পাওয়া গেলো গঞ্জের রেলস্টেশনের প্লাটফর্মে।হোসাইনকে খুঁজতে খুঁজতে এখানে আসতেই দেখা গেলো কিছু মানুষের জটলা।জটলা দেখে সুধিরাম এগিয়ে যেতেই দেখলো হোসাইন প্লাটফর্মের পাকায় জবুথবু হয়ে শুয়ে আছে।হাতের মুঠি খুব শক্ত করে খিচুনি দিয়ে কাঁপছে,ঠোঁট সাদা হয়ে আছে যেনো ঠোঁটের রক্ত উড়ে গেছে।এই দৃশ্যটা সূর্য্য উঠার আগ থেকেই হচ্ছিলো কিন্তু যেহুতে বাঙালি নাটকপ্রিয় জাতি সেহুতে একটা বাচ্চা শীতে কাঁপছে এই দৃশ্য দেখার মজাই আলাদা।কারো মনে এই কথা জাগ্রত হয় নি যে বাচ্চাটা অসুস্থ হয়ে গেছে হাসপাতালে নিয়ে যাই।
সুধিরামের চোখ দিয়ে অজান্তেই পানি চলে আসলো।ততক্ষণাক হোসাইনকে কোলে তুলে হাসপাতালের দিকে রওনা দিলো।শীতে শরীর ঠাণ্ডা হয়ে যাওয়ার কথা কিন্তু হোসাইনের শরীর জুড়ে জ্বরের আবহ।সুধিরাম হোসাইনকে এত শক্ত করে জড়িয়ে ধরে রেখেছিলো যে ওর শরীরের জ্বরের তাপ সুধিরাম তার অন্তর পর্যন্ত টের পাচ্ছিলো।বেটে ধরনের লোকটা প্রাণপণ দিয়ে চেষ্টা করছে হাসপাতালের দিকে জলদি করে যেতে কিন্তু যতই যাচ্ছে ততই মনে হচ্ছে।হাসপাতাল এত দূরে ক্যানো?
সুধিরাম মনে মনে প্রার্থনা করে যাচ্ছিলো ‘ভগবান আমার পাউডা আজকের লাইগা একটু বড় কইরা দেও।একটু জোরে দৌড়ানের শক্তি দেও।এই কষ্ট আর সইতে পারতাছি না।’
পর্যাপ্ত চিকিৎসার অভাবে হোসাইন মারা গেলো।শুরু হলো সুধিরামের আর্তনাদ।অবিকল বাচ্চাদের মতো করে কাঁদতে শুরু করলো।এমন আর্তনাদ যে ওর কান্না দেখে সামনের মানুষগুলোও কাঁদতে বাধ্য হলো।
হোসাইনকে বুকের সাথে শক্ত করে জড়িয়ে রাখলো।দেখে মনে হবে যেনো কতকালের বন্ধন ওদের ভিতর।হোসাইনকে কোলে করে নিয়েই সুধিরাম বাড়ি ফিরলো।শ্যামা হোসাইনের মৃত মুখ দেখেই হতভম্বের মতো চেয়ে রইলো।শ্যামা হোসাইনের গায়ে হাত দিতে চাইলে সুধিরাম কড়া ধমকের স্বরে বললো,
‘খবরদার এই পোলার শইলে তুই হাত দিবি না।তুই পাপী,মহাপাপী।ধর্মের নাম কইরা তুই পোলাডারে মারসোত।যা এখন উৎসব কইরা চ্যালচ্যালাইয়া স্বর্গে চইলা যা।’
শ্যামা নিশ্চুপ হয়ে বসে রইলো।এক অজানা শোক তার মনে বাসা বেধেছে।সুধিরাম উন্মাদের মতো কেঁদেই চলেছে।
সুধিরাম মসজিদে গিয়ে হোসাইনের মৃত্যুর খবর জানালেন আর বললেন,
‘মৌলানা সাব এই কাফনের কাপড় দিয়া পোলাডারে মাডি দিয়েন।’
মাওলানা সাহেব তার কথায় অস্বীকৃতি জানিয়ে বললেন,
‘অসম্ভব।কোনো হিন্দুর দেওয়া কাপড় দিয়ে মাটি দেওয়া জায়েজ না।’
সুধিরামের চোখে আবার পানি এসে গেলো।কান্নাজড়িত কণ্ঠে সুধিরাম বলে উঠলো,
‘কাফনের কাপড়ে তো কোনো জাত লেখা নাই।নেন না মৌলানা সাব।পোলাডার প্রতি যে হক আছে এইডা পূরণ করতে দেন।’
‘নিয়ম সবার জন্য সমান।আমি আপনার কাফনের কাপড় নিতে পারবো না।’
‘আপনার পায়ে ধরি মৌলানা সাব।জাতের দোষ দেখাইয়া আমারে এই হক থাইকা বঞ্চিত কইরেন না।পায়ে ধরি।আল্লাহর ওয়াস্তে নিয়া নেন।’
সুধিরাম মাওলানা সাহেবের পায়ে ধরে বসে রইলো।সুধিরামের এমন মমতাবোধ দেখে মাওলানা সাহেবের চোখ ভিজে গেলো কিন্তু তার পক্ষে এই কাজ করা সম্ভব না,আল্লাহর বিধানের উপর কিছুই করা যাবে না।মাওলানা সাহেব সুধিরামের হাত পা থেকে ছাড়াতেই সুধিরাম চিৎকার করতে কাঁদতে কাঁদতে বলতে থাকলো,
‘খোদা!মানুষ বানাইলা,মায়া দিলা,মহব্বত দিলা ধর্ম দিলা ক্যান?ধর্মের লাইগা মানুষ মানুষরে ভালোবাসতে পারে না এইডা ক্যামন বিধান খোদা?’

সম্পর্কিত পোস্ট

পূনর্জন্ম

জুয়াইরিয়া জেসমিন অর্পি . কলেজ থেকে ফিরেই পিঠের ব্যাগটা বিছানায় ছুড়ে ফেললো অন্বেষা। তারপর পড়ার টেবিলের কাছে গিয়ে চেয়ার টেনে নিয়ে ধপ করে বসে দুই হাত দিয়ে মাথাটা চেপে ধরলো।প্রচণ্ড মেজাজ খারাপ ওর। আজ ওদের সেমিস্টার ফাইনালের রেজাল্ট দিয়েছে। একদমই ভালো করেনি সে। যদিও শুরু...

অনুভূতি

অনুভূতি

লেখা: মুন্নি রহমান চারদিকে ফজরের আজানের সুমধুর ধ্বনি ভেসে আসছে। বাইরে এখনো আবছা অন্ধকার। তড়িঘড়ি করে বিছানা ছাড়লো মালা। ঘরের কাজ সেরে বের হতে হবে ফুল কিনতে। তাড়াতাড়ি না গেলে ভালো ফুল পাওয়া যায় না আর ফুল তরতাজা না হলে কেউ কিনতে চায় না। মাথার ওপরে তপ্ত রোদ যেন...

অসাধারণ বাবা

অসাধারণ বাবা

লেখক:সাজেদ আল শাফি বাসায় আসলাম প্রায় চার মাস পর। বাবা অসুস্থ খুব।তা নাহলে হয়তো আরও পরে আসতে হতো।গাড়ি ভাড়া লাগে ছয়শো পঁচিশ টাকা।এই টাকাটা রুমমেটের কাছ থেকে ধার নিয়েছি।তার কাছে এই পর্যন্ত দশ হাজার টাকা ঋণ হয়েছে।বলি চাকরি হলেই দিয়ে দিব। পড়াশোনা শেষ করে দুই বছর...

৪ Comments

  1. Eti Akter Chandni

    খুব ভালো লাগলো গল্প, গল্পটি পড়ার সময় মনে হচ্ছিল গল্পের চরিত্রের মাঝে সুধিরাম লেখক নিজেই, প্রতিটা মানুষের ধর্ম আছে, তবে সে যদি মানব ধর্মকে মনকে মেনে নিয়ে নিজেকে মানব ধর্মে কাজে লাগাতে পারে তাহলেই তো অনেক।
    গল্পে এক নিতুন বাস্তবতা দেখলাম, খাদ্য-চিকিৎসার অভাবে এই রকম হাজারো পথ শিশু মারা যায়।
    হয় নি-হয়নি, গেলো-গেল, মতো-মত, বানান গুলো এইভাবে হবে।

    Reply
  2. halima tus sadia

    ভালো লিখেছেন।

    কিছু মানুষ আছে ধর্মের দোহাই দিয়ে চলে।
    হিন্দুরা দেখি প্রায়ই মুসলমান কাউকে ভিক্ষা দিতে চায় না।
    বুঝি না,যে যেমন করে, তেমনই ফল পাবে।

    গল্পে হোসাইনের প্রতি সুধিরাম বাবুর ভালোবাসা ফুটে উঠেছে।
    কিছু ভালো মানুষ আছে বলেই পৃথিবীতে ভালোবাসা টিকে আছে।

    মিয়াঁ–মিয়া
    গেলো–গেল
    জিজ্ঞাস-জিজ্ঞেস
    হয় নি–হয়নি

    দেখসোত–দেখছোস

    মৌলানা–মাওলানা

    সেহুতে–সেহেতু

    ততক্ষণাত–তৎক্ষনাৎ

    শুভ কামনা রইলো।

    Reply
  3. Md Rahim Miah

    কম নি-কমনি(নি শব্দের সাথে বসে)
    শুনেই-শোনেই
    মিয়াঁ-মিয়া
    পাইবেন নি-পাইবেননি
    বড়ই- বরই
    হাটতেও-হাঁটতেও
    হাটতে-হাঁটতে
    হয় নি-হয়নি
    উঠলা নি-উঠলানি
    আছে নি-আছেনি
    কি-কী (কি হ্যাঁ আর না বুঝালে ব্যবহার হয়, কিন্তু এইখানে অন্যকিছু)
    বাধা-বাঁধা
    কি-কী
    বাড়িছাড়া -বাড়ি ছাড়া (যেহেতু দুইটা শব্দ)
    যেহুতে-যেহেতু
    সেহুতে-সেহেতু
    হয় নি-হয়নি
    যাই-যায়(নিজের বেলায় ই হয় অন্যজনের বেলা নয়)
    বাহ্ অসাধারণ লিখেছেন। সত্যিই মানুষ বানিয়েছে আর ধর্ম দিয়েছে। কিন্তু কিছু মানুষ সেই ধর্ম না মেনে বিপরীত ধর্মে চলে গিয়েছে।আর কিছু মানুষ আছে শুধু ধর্মের দোহাই দেয়। গল্পটা পড়ে অনেক ভালো লেগেছে। বেশ করে অনেক বাস্তব চিত্র ফুটে উঠেছে গল্পের মাঝে। কিছু বানান ভুল ছিল উল্লেখ করে দিয়েছি আগামীতে খেয়াল রাখবেন আশা করি, অনেক শুভ কামনা রইল।

    Reply
  4. আফরোজা আক্তার ইতি

    দারুণ! দারুণ! এই গল্পটা পড়ে আমার মনটা ভরে গেল। সত্যি বলতে এমন তৃপ্তিকর গল্পের আশায় ছিলাম আমমি বহুদিন। লেখকের লেখার হাত আর লেখনশৈলী অসাধারণ, উপস্থাপন ভঙ্গি মনকাড়া! কিভাবে পাঠককে নিজের লেখার দিকে আকর্ষণ করতে হয় সেটা খুব ভালো করেই জানে লেখক।
    পথশিশুদের নিয়ে অনেকে অনেক লেখাই লিখে, তবে আপনি গল্পটিকে একটি অন্যরকম থিম দিয়ে ভিন্নমাত্রার বাস্তবতা তুলে ধরেছেন। আমি মুগ্ধ হয়ে গেছি।
    এতিম সন্তানদের কষ্ট একমাত্র তারাই বুঝে, যাদের মাথার উপর কোনও ছায়া থাকে না, ঘুমানোর জন্য জায়গা থাকে না। সুধিরাম হিন্দুধর্মের হয়েও বাচ্চাটির প্রতি যে উদারতা দেখিয়েছে তা মানবধর্মের উদাহরণ হয়ে থাকবে।
    জিজ্ঞাস- জিজ্ঞেস।
    হাটতেও- হাঁটতেও।
    ক্যানো- কেন।
    কাটার- কাঁটার।
    ততক্ষণাত- তৎক্ষণাৎ।
    ভৎসনা- ভর্ৎসনা।
    খিচুনি- খিঁচুনি।
    যেহুতে, সেহুতে- যেহেতু, সেহেতু।
    বেটে- বেঁটে।
    অনেক শুভ কামনা আপনাকে প্রিয়।

    Reply

Submit a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *