ভুলের মাশুল
প্রকাশিত: অক্টোবর ১৮, ২০১৮
লেখকঃ

 37 বার দেখা হয়েছে

এই লেখক এর আরও লেখা পড়ুনঃ

হেলেন_আক্তার_মিম

চুয়াডাঙ্গার একটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ওহেদুর রহমান। অফিসে বসে নিজের কাজ করছিলেন, হঠাৎ দুইজন লোক তার অফিস কক্ষে হন্তদন্ত হয়ে ঢুকে পড়ে। এবং দেখেই কেমন যেন মাস্তান মাস্তান মনে হচ্ছে।
– আসসালামু আলাইকুম, কিছু বলবেন?
– হ্যা বলব বলেই তো আসছি।
– জ্বি বলেন, কি বলবেন।
– আমার একটা ছেলে চাই।
– ছেলে চাই মানে!! আমি শিক্ষক, শিক্ষা দেয়া আমার কাজ, ছেলে দেওয়া না। আর আপনারা কারা?
– আমাদের আপনি চিনবেন না। চেনার প্রয়োজনও নেই।
– এক্ষুনি বেরিয়ে যান বলছি।
– হ্যা, অবশ্যই যাব। তার আগে একটা চুক্তি করে যাব।
– কি চুক্তি, কিসের চুক্তি?
– শান্ত হন মাষ্টার মশাই। এতো উত্তেজিত হওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই।
– যা বলার তাড়াতাড়ি বলে, বেরিয়ে যান। আমার সময় নষ্ট হচ্ছে।
– এই তো সোজা পথে এসেছেন।
– বলেন।
– আমরা মানব পাচারকারী……
– কি!!!!!
– আমার কথা এখনো শেষ হইনি।
– আপনাকে পাঁচ লক্ষ টাকা দিব, আমাদের একটা ছেলে দিতে হবে।
– আমি আপনাদের পুলিশে দিব।
– এই নিন দুই লক্ষ পঞ্চাশ হাজার টাকা, বাকিটা মাল পাওয়ার পর দিব। আসি, আসসালামু আলাইকুম।
ওয়াহেদুর রহমানকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই চলে যান। তিনি আর কোনো কাজই করতে পারছেন না। টাকাগুলোর দিকে একমনে চেয়ে আছেন। কি করবেন সেটাই ভেবে পাচ্ছেন না।
– স্যার আসব?
কারো কথা শুনে টাকাগুলো লুকিয়ে রাখেন।
– জ্বি আসেন।
– স্যার কিছু হয়েছে, চিন্তিত মনে হচ্ছে।
– না আমি ঠিক আছি।
– শরীর খারাপ স্যার?
– নাআআ, হালকা মাথা ব্যাথা।
– চা করে দিতে বলব স্যার?
– না ঠিক আছে।
– আচ্ছা স্যার, আসি।
– রাফিন শুন,
– জ্বি স্যার বলেন।
– তোমার কি আর কোনো ক্লাস আসে?
– না স্যার। কিছু বলবেন স্যার?
– না কিছু না।
– সমস্যা নেই স্যার বলেন।
– বলছিলাম,,,,
– বলেন স্যার
– আমার মাথা ব্যাথা করছে, বাসায় যাব। তুমি কি স্কুল সামলাতে পারবে?
– অবশ্যই স্যার, কেন নয়। আপনি বাসায় যেয়ে রেস্ট করেন। আমি সব সামলে নিব।
– আচ্ছা, তুমি তাহলে যাও। আমি বের হচ্ছি।
– ওকে স্যার।
টাকাগুলো নিয়ে বাসায় চলে আসে ওহেদুর রহমান।
– সায়ানকে নিয়ে আসলে না যে?
বাসায় ঢুকতেই ওহেদুর রহমানের স্ত্রী সায়মা বেগম তাকে উক্ত প্রশ্নটি করে। সায়ান তাদের একমাত্র ছেলে। ওহেদুর রহমানের স্কুলেই চতুর্থ শ্রেণীতে পড়ে।
– সায়ান স্কুল ছুটি হলে আসবে।
– তুমি এতো তাড়াতাড়ি চলে আসলে যে?
– একটু মাথা ব্যাথা করছে তাই চলে আসলাম। তুমি একটু চা করে দাও।
সায়মা বেগম যেতেই টাকাগুলো একটা গোপন জায়গায় লুকিয়ে রাখলেন। যেন সায়মা বেগমও খুজে না পায়।
– এই নাও চা টা খেয়ে ঘুমাও।
– হুমম, তুমি যাও।
শুয়ে থেকেও কিছুতেই ঘুম হচ্ছে না ওহেদুর রহমান এর। একবার ভাবছে টাকাগুলো নিবে, আর একবার ভাবছে নিবে না। এরকম ভাবতে ভাবতেই সায়ান চলে আসে।
– বাবাই তুমি আমাকে আজ না নিয়েই চলে আসছ কেন?
– সরি বাবু, আমার একটু মাথা ব্যাথা করছিল তাই চলে আসছি।
– বাবাই জানো আজকেও অয়ন টিফিন নিয়ে আসে নি, আমার টিফিন ওঁকে দিছি। ভালো করছি না বাবাই?
– হুমম বাবু অনেক ভালো করছ। যাও ফ্রেশ হয়ে নাও।
সায়ান চলে যেতেই অয়নের কথা ভাবতে থাকে ওহেদুর রহমান। সায়ান এর বাড়ি ওহেদুর রহমানের গ্রামেই। হতদরিদ্র পরিবারের ছেলে। পরিবারটাও অনেক বড়। আট সদস্যের একটা পরিবার। একবেলা খায় তো দুবেলা না খেয়ে থাকে। অয়নের যদি কিছু হয় তো অয়নের পরিবারের কিছুই হবে না৷ বরং একজন সদস্য কমবে। ওহেদুর রহমান ভাবে অয়নকেই দিবে। তার বিনিময়ে পাঁচ লক্ষ টাকা পাবে। যেটা কম না। পরের দিন বিদ্যালয়ে যেয়ে তাঁর অফিস কক্ষে বসে আছে, সেই লোক দুটি আবার আসে।
– কি মাষ্টার মশাই কি ভাবলেন?
– না মানে,,,,
– এই নিন আরো দুই লক্ষ পঞ্চাশ হাজার টাকা।
– কেউ যদি জেনে যায়,
– কেউ জানবে না। আমরা কি শো করে বেড়াব নাকি যে জেনে যাবে। আপনি শুধু ছেলেটাকে দিবেন। বাকি সব আমরা দেখব।
– আচ্ছা ঠিক আছে। আপনারা এখানে আর আসবেন না। কেউ সন্দেহ করতে পারে।
– আচ্ছা আসব না। ফোন করে জায়গা বলে দিব, মাল পাঠিয়ে দিবেন।
– নাম্বার……….
– আছে।
বুঝতে পারে এরা প্রস্তুতি নিয়েই আসছে।
– আচ্ছা এখন যান।
– হুমম আসি। কথার খেলাফ যেন না হয়।
– আচ্ছা আচ্ছা।
লোক দুটো যেতেই ওহেদুর রহমান যেন হাফ ছেড়ে বাঁচে। এদিক সেদিক তাকিয়ে দেখে নিজের চেয়ারে এসে বসে। খুব চিন্তা হচ্ছে, কিন্তু কাজটা যে তাকে করতেই হবে। টাকাগুলো নিয়ে নিছে, কাজ না করলে যদি পরে ঝামেলা করে। এদের বিশ্বাস নেই। টিফিন টাইমে বাইরে এসে দেখে সায়ান এবং অয়ন খেলা করছে। কতো ভালো লাগছে এদের দেখতে।
– না এটা ঠিক না, আমি টাকা নিয়ে নিছি। আমার আবেগী হলে চলবে না।
আপন মনেই বলে ওহেদুর রহমান। কল আসলেই কেমন যেন ভয়ে ভয়ে রিসিভ করে। কিন্তু যেগুলো কল আসে সবগুলোই ফোন বুকে সেভ করা। তবুও কেমন যেন ভয় করতে থাকে ওহেদুর রহমান। এই বুঝি ওই লোক দুটি কল দিল। কিন্তু সারাদিনে ওরা আর কল দেয় নি। তার পরের দিনও ভয়ে থাকে, কিন্তু তার পরের দিনও কল দেয় না। এই দুই দিন ওহেদুর রহমান ঠিক মতো খেতে পারে নি, ঘুমাতে পারে নি। কেমন যেন ভয়ে ভয়ে কেটেছে। তার পরের দিন টিফিন টাইমে আননোন নাম্বার থেকে কল আসে। আননোন নাম্বার দেখেই ভয় পেয়ে যায়। তবুও ভয়ে ভয়ে রিসিভ করে।
– আমরা স্কুলের পিছনে আছি। মাল পাঠিয়ে দেন।
বলেই কল কেটে দেয়। ভয় পায় তবুও অয়নকে ডাকে
– অয়ন
– জ্বি স্যার।
– এদিকে আস।
– জ্বি স্যার বলেন।
– স্কুলের পিছনে কিছু ছেলে আছে, আমার কিছু দরকারি কাগজপত্র আছে ওদের কাছে নিয়ে এসে দিবে বাবা?
– আচ্ছা স্যার যাচ্ছি।
বলেই চলে যেতে যায় আর তখনই সায়ান অয়নের কাছে আসে।ওহেদুর রহমান সায়ানকে ডাকারও সময় পান না। অয়নের মাথায় লাল ক্যাপ থাকে। ওহেদুর রহমান সাথে সাথে ওই নাম্বারে কল দেয়।
– দুইটা ছেলে গেছে যার মাথায় লাল ক্যাপ আছে সেই ছেলেটিকে নিবে।
– আচ্ছা আচ্ছা।
বলেই কল কেটে দেয়।
এদিকে সায়ান অয়নের মাথা থেকে ক্যাপ নিয়ে নিজে মাথায় দেয়। কিছুক্ষণ পর ওহেদুর রহমান দেখে অয়ন একা আসছে এবং ওর মাথায় ক্যাপও নেই। যা বোঝার তা বুঝে গেলেন। সাথে সাথে আবার কল দেয়
– হ্যালো আপনারা যাকে নিয়ে গেছেন ওটা আমার ছেলে। আমি যাকে বলেছিলাম তাকে রেখে আমার ছেলেকে নিয়ে গেছেন। আমার ছেলেকে ফেরত দিয়ে এই ছেলেটিকে নিয়ে যান।
– আর ফেরত দিতে পারব না। পাঁচ লক্ষ টাকা দিছি, ওটা নিয়েই থাকেন।
বলেই কল কেটে দিয়ে ফোন অফ করে রাখেন। ওহেদুর রহমান বার বার কল দিয়ে আর না পেয়ে বাসায় চলে যান। বাসায় যেতেই সায়মা বেগম তাকে সায়ানের কথা জিজ্ঞাসা করতেই হু হু করে দেয়। সায়মা বেগম আরো ভয় পেয়ে যান।
– আমার ছেলে কোথায়?
– তোমার ছেলে আর নেই
বলে আবারও কান্না করে দেয়। কান্না থামিয়ে সায়মা বেগমকে সবটা বলে। এবার সায়মা বেগমও কান্না শুরু করে দেয়। কান্নার আওয়াজ শুনে প্রতিবেশীরাও চলে আসে, কিছুক্ষণ পর সবাই ঘটনাটি জেনে যায়। অয়নের মা ও আসে আর বলে
– আমরা গরীব তাতে কি, আমরা মানুষ না,,। আপনি আপনার সন্তানকে যতটুকু ভালোবাসেন আমরাও ঠিক ততটুকুই ভালোবাসি। আমাদেরও ইচ্ছা করে আমাদের সন্তানদের আপনাদের মতো ভালো পোশাক পরাতে, ভালো খাওয়াতে, কিন্তু আমরা পারি না। তবুও আমাদের সন্তানদের ততটুকুই ভালোবাসি যতটুকু একজন বাবা-মা বাসে।
বলেই স্কুলের দিকে হাটতে থাকেন। ঘটনাটি থানা পর্যন্ত চলে যায়। পুলিশ আসে ওহেদুর রহমানকে গ্রেপ্তার করে। বিচারে তাকে পনের বছরের সাজা দেন।
——————-সমাপ্ত———————

সম্পর্কিত পোস্ট

পূনর্জন্ম

জুয়াইরিয়া জেসমিন অর্পি . কলেজ থেকে ফিরেই পিঠের ব্যাগটা বিছানায় ছুড়ে ফেললো অন্বেষা। তারপর পড়ার টেবিলের কাছে গিয়ে চেয়ার টেনে নিয়ে ধপ করে বসে দুই হাত দিয়ে মাথাটা চেপে ধরলো।প্রচণ্ড মেজাজ খারাপ ওর। আজ ওদের সেমিস্টার ফাইনালের রেজাল্ট দিয়েছে। একদমই ভালো করেনি সে। যদিও শুরু...

অনুভূতি

অনুভূতি

লেখা: মুন্নি রহমান চারদিকে ফজরের আজানের সুমধুর ধ্বনি ভেসে আসছে। বাইরে এখনো আবছা অন্ধকার। তড়িঘড়ি করে বিছানা ছাড়লো মালা। ঘরের কাজ সেরে বের হতে হবে ফুল কিনতে। তাড়াতাড়ি না গেলে ভালো ফুল পাওয়া যায় না আর ফুল তরতাজা না হলে কেউ কিনতে চায় না। মাথার ওপরে তপ্ত রোদ যেন...

অসাধারণ বাবা

অসাধারণ বাবা

লেখক:সাজেদ আল শাফি বাসায় আসলাম প্রায় চার মাস পর। বাবা অসুস্থ খুব।তা নাহলে হয়তো আরও পরে আসতে হতো।গাড়ি ভাড়া লাগে ছয়শো পঁচিশ টাকা।এই টাকাটা রুমমেটের কাছ থেকে ধার নিয়েছি।তার কাছে এই পর্যন্ত দশ হাজার টাকা ঋণ হয়েছে।বলি চাকরি হলেই দিয়ে দিব। পড়াশোনা শেষ করে দুই বছর...

১ Comment

  1. shahrulislamsayem@gmail.com

    কাহিনী ভালো হলেও গল্পের প্লট বেশ কমন, বানান ভুল একটা লক্ষ্য করেছি সেটা হল ‘ওঁর’- ওর, আর একটা লাইনে অয়নের জায়াগায় সায়ান লিখেছেন………সায়ানের বাড়ি ওহ্বদুর রহমানের গ্রামেই -অয়নের বাড়ি ওহেদুর রহমানের গ্রামেই

    Reply

Submit a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *