ভাগ্যের লড়াই
প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ৫, ২০১৮
লেখকঃ

 39 বার দেখা হয়েছে

এই লেখক এর আরও লেখা পড়ুনঃ

লেখা- আল বিনাতুন মাওলা চৈতী ( চারু লতা)

শিউলি একটি মফস্বল শহরের মেয়ে। মেয়েটি দেখতে অনেক সুন্দর । নিজ শহরেরই একটি কলেজে পড়াশোনা করে সে। বলতে গেলে তার কলেজের প্রায় সব মেয়ের থেকেই সে সুন্দরী। স্বভাবতই তাকে অনেক ছেলেই পছন্দ করে। তার বাবা একজন গরীব কৃষক। তাই, মেয়েকে বেশিদূর লেখাপড়া করানোর পক্ষপাতী না সে।
কিছুদিন ধরে শিউলি একটি সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছে। সমস্যাটি হচ্ছে, পাড়ার কিছু বখাটে ছেলেপুলে তাকে ভীষণ বিরক্ত করছে। তাই আজ শিউলি রেগে গিয়ে সব থেকে অভদ্র ছেলেটার গালে চড় বসিয়ে দিয়েছে। ছেলেটি রাগে গজগজ করতে করতে বললো,
— কাজটা তুই ভালো করলি না। এর মজা তুই টের পাবি। হারে হারে টের পাবি।
শিউলি এক অাল্লাহ ছাড়া আর কাউকেই ভয় পায়না। তাই সে অভদ্র ছেলেটির কথা গায়ে লাগায় না। সে তার মতোই চলতে থাকে। প্রতিদিন কলেজে যাওয়া আসা করে। তেমনই একদিন কলেজ যাওয়ার পথে, সেই অভদ্র ছেলেটা শিউলির মুখে এসিড ছুড়ে মারলো। শিউলি মুহুর্তের মাঝে একটি বিকট আর্তনাদ করে মাটিতে লুটিয়ে পড়লো। স্থানীয় সবাই হন্তদন্ত হয়ে তাকে হাসপাতালে নিয়ে গেল। শিউলিকে বাঁচানো গেলো কিন্তু ডাক্তার বললেন যে, শিউলির মুখ আর কখনোই ভালো হবে না।
এ ঘটনার পর থেকে শিউলির বাবা মা শিউলির সাথে প্রায়সময় গঞ্জনা দেওয়া কথাবার্তা বলে। যেমন ওর মা কিছুদিন আগে বলেছিল,
— তুই মরতে পারিস না। বেঁচে আছিস ক্যান? তোর পোড়া মুখ নিয়ে কে বিয়া করবে?
শিউলির বাবাও ওকে বলে,
— ম্যাট্রিক পাশ কইরা পড়াশোনা ছাইড়া দিলেই পারতি। পড়াশোনা করছিস ক্যান? এখন তো তোকে বিয়া দিবার পারবো না। আমার ঘাড়ত বইসা থাকবি সারাজীবন।
এগুলো কথা শুনে শিউলির আত্মহত্যা করতে মন চায়। এখন আর সে কলেজে যায় না। তার বাবা যেতে দেয় না। একদিন গিয়েছিল বাবার কথা অগ্রাহ্য করে। কিন্তু বান্ধবীদের খোঁচা দেওয়া কথা যেন বাবা মায়ের কথার চেয়েও বেশী তিতা মনে হয়।
একদিন দুপুরবেলা শিউলি খাবারে পোড়া ভাত পায়, তাই মাকে বলে,
— মা, ভালা ভাত নাই? এইডা তো পোড়া।
উত্তরে তার মা বললো
— যার মুখটাই পোড়া সে ভালা ভাত দিয়া কী করবে? ঐ খাবার না খাইতে পারলে তোর খাওনের দরকার নাই। মইরা যা তুই।
এ কথা শুনে শিউলির খুব খারাপ লাগে। সে সিদ্ধান্ত নেয় যে আত্মহত্যা করবে। এ সিদ্ধান্ত নিয়েই সে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ে, চলে যায় রেলওয়ে স্টেশনে। উদ্দেশ্য ট্রেইনের চাকার নীচে নিজেকে সঁপে দেওয়া। স্টেশনে যাওয়ার পর জানতে পারলো, পরবর্তী ট্রেইন এখন থেকে আরও বিশ মিনিট পরে আসবে। তাই সে প্লাটফর্মেই বসে রইলো। হঠাৎ সে দেখতে পেলো প্লাটফর্মে তার থেকে কিছু দূরে বসে একটি মেয়ে কাঁদছে। বয়স আনুমানি ২৪/২৫ হবে। তার খুব ইচ্ছে হল মেয়েটির কাছে গিয়ে তার কান্নার কারণ জিজ্ঞেস করতে। তাই সে আর দেরী না করে মেয়েটির কাছে গিয়ে বললো,
— আপনি কাঁদছেন কেন আপু?
মেয়েটি চোখের পানি মুছে শিউলির দিকে তাকালো। তাকিয়েই সে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলো,
— আপনার মুখটা পুড়লো কীভাবে আপু?
— আমার গল্পটা পরে বলবো। আগে আপনার কান্নার কারণটা বলুন আপু।
তারপর মেয়েটি বলা শুরু করে,
— দুঃখের কথা আর কী বলবো আপু? আমি অনেক অভাগী একটা মেয়ে। আমার নাম লিপি। পড়াশোনা করতে চেয়েছিলাম। ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষাও দিয়েছি। আল্লাহর রহমতে রেজাল্টও আমার ভালো হয়। আব্বা আর পড়াতে চায়নি। তবুও জোর করে এখানেই একটা ডিগ্রী কলেজে রাষ্ট্রবিজ্ঞান নিয়ে অনার্স পড়া শুরু করি। অনার্স পড়া শেষ করতে করতেই আমার বয়স ২৪ পেরিয়ে যায়। বাবা আর আমাকে পড়াতে চায় না। বিয়ে দেয়ার জন্য উঠে পড়ে লাগে। কিন্তু কেউ আমাকে বিয়ে করতে চায় না। আমার নাকি বয়স বেশী হয়ে গেছে। অবশেষে ঘটকের মাধ্যমে একটা প্রস্তাব আসে। ছেলের মিষ্টির দোকান আছে। কিন্তু বয়স্কা মেয়ে বিয়ে করতে নাকি তার যৌতুক চাই। বাবা সেই শর্তেই রাজী হয়ে গেল। কোনমতে মেয়েকে পার করতে পারলেই তিনি খুশি। যৌতুক হিসেবে তারা টিভি, ফ্রিজ আর মোটর সাইকেল চেয়েছিল। আর আমাকে এক ভরি স্বর্নালংকার দিয়ে নাকি সাজিয়ে দিতে হবে। আমার গরীব বাবার পক্ষে কি এত কিছু দেয়া সম্ভব। তিনি টিভি আর আমাকে স্বর্নালংকার দিলেন। ফ্রিজ আর মোটরসাইকেল পরে দিবেন বলে কথা দেন। বিয়ের এক বছর পর কোনমতে টাকা যোগাড় করে বাবা একটি সেকেন্ড হ্যান্ড মোটর সাইকেল কিনেছিল। সে কথাটা ওরা জানতে পারার পরপরই আমার উপর অমানবিক অত্যাচার শুরু করে দেয়। আর বাবাকেও বলে দেয় যে, যদি ফ্রিজ আর এক মাসের মাঝে দিতে পারে তাহলে সেকেন্ড হ্যান্ড মোটর সাইকেল দেয়ার অপরাধ ক্ষমা করে দিবে আর যদি না দিতে পারে, তাহলে আমাকে বাড়ি থেকে বের করে দিবে। আজ সেই এক মাস পূর্ণ হলো আপু। ওরা আমাকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছে। কোন মুখে আমি বাবার সামনে গিয়ে দাঁড়াবো।
এ কথাগুলো শুনে শিউলির মনে হল, মেয়েটি তার মতোই অভাগী। শুধু দূর্ভাগ্যের ধরণটা ভিন্ন। তারপর শিউলি লিপিকে তার দুঃখের কাহিনী বললো। লিপি শিউলির কথা শুনে বললো,
— আমিও তো আত্মহত্যা করতে এসেছি আপু। কিন্তু এখন তোমার সাথে পরিচয় হওয়ার পর মনে হচ্ছে, আত্মহত্যা না করে এ সমাজকে কিছু একটা দেখিয়ে দেই।
শিউলি লিপির কথায় সায় দিয়ে বললো,
— হুম। কিন্তু এই মুহুর্তে করবো টা কী?
তারপর লিপি জানায় যে, সে নাকি সেলাই করতে পারে।
কথাটা শুনে শিউলি কিছুক্ষনের জন্য আনন্দিত হলেও পরক্ষনেই আবার ভেংগে পড়ে। ওদের কাছে না আছে সেলাই মেশিন না আছে টাকা।
কিন্তু লিপি তাকে অাশ্বাস দিয়ে জানায় যে, সে তার কানে থাকা দুলজোড়া বিক্রি করে দিবে।
কিন্তু শুধুমাত্র কানের দুল বিক্রির টাকায় তো আর সেলাই মেশিন কেনা যাবে না। শিউলির হাতে একটা আংটি ছিল, সে ঐটা বিক্রি করারও সিদ্ধান্ত নেয়। দুজনের প্রচেষ্টায় অবশেষে একটা সেলাই মেশিন কিনতে সক্ষম হয় তারা।
দুজনে ঢাকায় যায়। বস্তির একটি বাড়িতে ওঠে। শিউলি বাড়ি বাড়ি ঘুরে জামা সেলাই এর অর্ডার নিয়ে আসে, আর লিপি ওগুলো সেলাই করে আবার শিউলির হাত দিয়ে পাঠিয়ে দেয়। কয়েক মাস পর আর শিউলির বাড়ি বাড়ি ঘুরতে হয় না। লোকজনই তাদের কাপড় দিয়ে যায় সেলাই করার জন্য। এখানে তুলনামূলক অনেকটা সাশ্রয় হয়। তাই সেলাই এর অর্ডার এখানে বেশী। কিছুদিন পর আর একটি সেলাই মেশিন কিনে ফেলে ওরা। এতদিনে শিউলিও সেলাই করা শিখে গেছে। অনেক রোজগাড় হয় তাদের। এখন আর তারা বস্তিতে থাকেনা। শহরে বাসা ভাড়া নিয়ে থাকে।
ভাগ্যের ফেরে তারা নিজেদের মতো আরেকটি মেয়ের সন্ধান পায়। মেয়েটির নাম সুমি। সে মেয়েটি আবার বুটিক্স এর কাজ ভালো জানে। আজ তারা একটি ব্যাবসায়ীক প্রতিষ্ঠাণ খুলেছে। নাম দিয়েছে ‘ স্বপ্নের নীড় সেলাই এ্যান্ড বুটিক্স’
এই সেই প্রতিষ্ঠাণ, যেখানে হাজার হাজার আত্মহত্যা করতে চাওয়া মেয়েদের কর্মসংস্থান হয়। তারা আর সমাজের বোঝা নয়। আজ তারা সাবলম্বী।

সম্পর্কিত পোস্ট

পূনর্জন্ম

জুয়াইরিয়া জেসমিন অর্পি . কলেজ থেকে ফিরেই পিঠের ব্যাগটা বিছানায় ছুড়ে ফেললো অন্বেষা। তারপর পড়ার টেবিলের কাছে গিয়ে চেয়ার টেনে নিয়ে ধপ করে বসে দুই হাত দিয়ে মাথাটা চেপে ধরলো।প্রচণ্ড মেজাজ খারাপ ওর। আজ ওদের সেমিস্টার ফাইনালের রেজাল্ট দিয়েছে। একদমই ভালো করেনি সে। যদিও শুরু...

অনুভূতি

অনুভূতি

লেখা: মুন্নি রহমান চারদিকে ফজরের আজানের সুমধুর ধ্বনি ভেসে আসছে। বাইরে এখনো আবছা অন্ধকার। তড়িঘড়ি করে বিছানা ছাড়লো মালা। ঘরের কাজ সেরে বের হতে হবে ফুল কিনতে। তাড়াতাড়ি না গেলে ভালো ফুল পাওয়া যায় না আর ফুল তরতাজা না হলে কেউ কিনতে চায় না। মাথার ওপরে তপ্ত রোদ যেন...

অসাধারণ বাবা

অসাধারণ বাবা

লেখক:সাজেদ আল শাফি বাসায় আসলাম প্রায় চার মাস পর। বাবা অসুস্থ খুব।তা নাহলে হয়তো আরও পরে আসতে হতো।গাড়ি ভাড়া লাগে ছয়শো পঁচিশ টাকা।এই টাকাটা রুমমেটের কাছ থেকে ধার নিয়েছি।তার কাছে এই পর্যন্ত দশ হাজার টাকা ঋণ হয়েছে।বলি চাকরি হলেই দিয়ে দিব। পড়াশোনা শেষ করে দুই বছর...

১৫ Comments

  1. আখলাকুর রহমান

    কিছু ভুল তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। দেখে নিবেন আশা করি।

    হারে হারে – হাঁড়ে হাঁড়ে

    ছুড়ে – ছুঁড়ে

    কোনমতে – কোনো মতে

    কিছু দেয়া সম্ভব। – সম্ভব? (“?” বাক্যের শেষে বসবে)

    রোজগাড় – রোজগার

    ব্যাবসায়ীক – ব্যবসায়িক

    প্রতিষ্ঠাণ – প্রতিষ্ঠান

    মুগ্ধকর লেখনী। শিক্ষণীয় বলা যায়।
    নারী সমাজ অনুপ্রাণিত হবে।
    শুভ কামনা রইল।

    Reply
    • chaity

      thanks

      Reply
    • চারু লতা

      ধন্যবাদ। দোয়া রাখবেন

      ♥♥

      Reply
  2. Md Rana

    শুভ কামনা রইল।সুন্দর হইছে……।।

    Reply
  3. Md Rana

    শুভ কামনা রইল।সুন্দর হইছে…।।

    Reply
  4. Md Rana

    শুভ কামনা রইল।সুন্দর হইছে…।

    Reply
  5. aanika ibtisam

    great…keep it up…

    Reply
  6. নীল তুষার

    অসাধারন কিছু গুরুচণ্ডালী দোষ আছে । কিন্তু তা মার্জনিয়।

    Reply
  7. Md. Nasfiul Alam

    vlo lekasan. carry on 🙂

    Reply
  8. shuvo

    vallaglo..shobi jdi evabe ghure darato tahle hoyto ajk r shomaj ta r erokm thakto na

    Reply
  9. আফরোজা আক্তার ইতি

    অসাধারণ অনুপ্রেরণামূলক একটি গল্প। লেখিকাকে ধন্যবাদ আমাদের এতো সুন্দর একটি গল্প উপহার দেয়ার জন্য। আমাদের সমাজে এমন অনেক মেয়েই অনেক তুচ্ছ কারণের লাঞ্ছনার শিকার হচ্ছে, বঞ্চিত হচ্ছে অনেক ভালো কিছু থেকে। অথচ তারাও যে সমাজে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে, কোনকিছুতে হার মা মেনে এই গল্প থেকে সবাই এটা শিখতে পারবে। বানানে কিছু ভুল আছে। সংশোধন করে দেই।
    হারে হারে- হাড়ে হাড়ে।
    ছুড়ে- ছুঁড়ে।
    বেশী- বেশি।
    নীচে- নিচে।
    আনুমানি- আনুমানিক।
    দেরী- দেরি।
    পরক্ষনেই- পরক্ষণেই।
    ভেংগে- ভেঙে।
    প্রতিষ্ঠাণ- প্রতিষ্ঠান।

    Reply
  10. oblet

    অনুপ্রেরণাদায়ক গল্প। খুব ভালো। এগিয়ে যাও।

    Reply
  11. Safin Rahman

    নারীরা যে পারে,তারই প্রমাণ দিয়েছেন এই গল্পের লেখিকা। যার লেখায় ফুটে এসেছে,মেয়েদের প্রতি সমাজের নিগ্রহ এবং অত্যাচারের কাহিনী।।
    ভয়ংকর সুন্দর একটা লেখা। খুব ভালো লাগলো।।

    Reply
  12. চারু লতা

    ধন্যবাদ সকলকে

    Reply
  13. মাহফুজা সালওয়া

    অনেক সুন্দর, শিক্ষনীয় একটি গল্প।
    গল্পের কাহিনী অসাধারণ!
    তবে,লেখিকাকে গল্প উপস্থাপনে আরও যত্নশীল হওয়ার অনুরোধ রইল।
    গুরুচণ্ডালী দোষ, বানান,বিরামচিহ্ন এগুলোতে অনেক ভূল রয়েছে।
    তবে,লেখিকার কল্পনাশক্তির প্রশংসা করতেই হয়।
    খুব সুন্দর একটি বিষয় নিয়ে লিখেছেন আপনি!????????????????শুভকামনা

    Reply

Submit a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *