আমার বাবা
প্রকাশিত: অগাস্ট ২১, ২০১৮
লেখকঃ

 62 বার দেখা হয়েছে

এই লেখক এর আরও লেখা পড়ুনঃ

লেখা: সাজ্জাদ আলম বিন সাইফুল ইসলাম
.
.
দীর্ঘ পনেরো বছর পর তালাবন্ধ ঘরটার সামনে দাঁড়িয়ে অাছি। ভেতরে ঢোকার সাহস কুলাচ্ছে না। বুকের বা-পাশটা ব্যথায় চিনচিন করছে। চোখের এককোণায় পানি জমে গেছে। তবুও সেটা অনেক কষ্টে চেপে রেখে ঘরটা খুললাম। চাবিটা ব্যবহার না করার ফলে জঙ ধরেছে। ঘরের এককোণের এই ঘরটাতে ঢুকতেই কিছু ধূলিকণা আমার শরীরের উপরে এসে পড়লো। আমি দরজাটা অাস্তে করে ভেজিয়ে বাল্বটা জ্বালানোর চেষ্টা করেও ব্যর্থ হলাম। অনেকদিন ব্যবহার না করার ফলে নষ্ট হয়ে গেছে। লোকমুখে শুনেছি, ইলেক্ট্রিক জিনিষ ব্যবহার না করলে নাকি সেগুলো নষ্ট হয়ে যায়। আজ তা স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি। ঘরটা যেমন ছিলো ঠিক তেমনি অাছে। কোনরূপ পরিবর্তন নেই। সবগুলোই তার হাতে গোছানো।
মোবাইলের টর্চটা অন করে ঘরটার চারদিক ঘুরে দেখতে লাগলাম। ঘরটা অনেকখানি থমথমে। অনেকদিন তালাবন্ধ অবস্থায় থাকার কারণে মাকড়শা জাল বেঁধে নির্বিঘ্নে বাস করছে। চশমাটা এখনো টেবিলের উপরে সাজানো অাছে। আমি পাঞ্জাবীর কোণা দিয়ে মুছে চোখে দিয়ে বুঝলাম এখন সেটা অনেকটা ঘোলাটে। ফের টেবিলের উপরে রেখে শোকেসটার দিকে গেলাম। সবকিছুই ঠিকঠাক। বাবার বুকশেলফটার বইগুলোর উপরে ধুলাবালি জমে খানিকটা স্তুপ হয়ে গেছে।
খুব বেশি লেখাপড়া না জানলেও বাংলা লেখা পড়তে তার কোনো অসুবিধাই হতো না। মাঝে মাঝে তাকে অনেক বই এনে দিতাম। বাবা সংসারের টুকটাক কাজ করার পর বাকি সময়টা বই নিয়ে কাটাতো। তাকে অনেক অাজব মানুষ মনে হয়। আমি বাবার শোকেসটা প্রথমবারের মতো খুললাম। কয়েকটা পাঞ্জাবী তাতে গোছানো। মনে পড়ে, সেখানকার মেটে বর্ণের পাঞ্জাবীটা চাকরির প্রথম বেতন পেয়ে বাবাকে এনে দিয়েছিলাম। সেদিন বাবা আমার কপালে চুমু খেয়ে জড়িয়ে ধরেছিলো। পাঞ্জাবীটা বাবা শুধু একদিনই পরেছিলেন, আমার বিয়ের দিন। পাঞ্জাবীটা হাতে নিতেই সেদিনের কথা খুব মনে পড়ে গেল। হঠাৎ চোখ গেল পাঞ্জাবীর নিচে শক্ত কিছু, সম্ভবত বই হবে। আমি পরের পাঞ্জাবীটা সরিয়ে দেখলাম ডায়েরী, একটা খুব পুরাতন ডায়েরী। পাঞ্জাবীটা শোকেসে রেখে ডায়েরীটা নিয়ে বাবার চেয়ারটাতে বসলাম, ঠিক বাবার ভঙিতে। ডায়েরীটা খুলবো কী খুলবো না এ নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়ে গেলাম।
বাবার ডায়েরীতে কী না কী অাছে, সেটা খোলা কি আমার জন্য উচিত? নাকি অনুচিত। ডায়েরীটার উপরে হাত দিয়ে অালতো করে স্পর্শ করলাম। হঠাৎ বুঝতে পারলাম আমার চোখের কোণে পানি জমা হয়েছে। জীবনের স্রোতে ভাসতে ভাসতে আমরা কতকিছুই না ভুলে যাই।
ভুলে যাই আমাদের অতীত বাস্তবতা। কী ছিলাম অতীতে, মাঝখানে কেমন ছিলাম আর এখন কেমন অাছি।
চেয়ার থেকে উঠে জানালার পর্দাটা খুলে দিলাম। মৃদু বাতাস অাসছে। বাইরের অাকাশটা বেশ মেঘলা অাজ। বর্ষার দিন অাগত, হয়তো আজকেই অাকাশ কেঁদে দিবে। নয়তো তার অাগমনী বার্তার কিছুটা মানুষদের বুঝিয়ে ঘুমের দেশে চলে যাবে।
জানালার পর্দাটা সরানোর কারণে কিছুটা অালো এসে ঘরের ভিতরে পড়ছে। কতদিন এমন করে ভাবি না আমি। আজ হঠাৎই মনে পড়ে যাচ্ছে গ্রাম্য একটা ছেলের কথা। যার মা তাকে জন্ম দিয়েই অভিমান করে চলে গিয়েছিলো। তারপর তার ঠাঁই হয়েছিলো বাবার বুকে, একেবারে খুব গভীরে। অাত্মীক সম্পর্কটা এতটাই গভীর হয়েছিলো যে দ্বিতীয়বারের মতো বিয়ের পিঁড়িতে বসার কোনো লক্ষণই ছিলো না তার মাঝে। যার কারণে হয়তো ছোট্ট সিফাতকে ভালোভাবে মানুষ করতে পেরেছেন।
হঠাৎ করে পিছন থেকো অাওয়াজ আসলো, ‘এ কী তুমি এখানে? এত বছর পর!’
ফাতেমা সম্ভবত অামাকে এ ঘরে দেখে খানিকটা অাশ্চর্য হয়েছে। আমি কোনো কথা না বলে হাত দিয়ে তাকে চলে যাওয়ার জন্য ইশারা করলাম। পরে অার কোনো শব্দ শুনতে পেলাম না। হয়তো ফাতেমা চলে গেছে।
বাবার হয়তো ছোট্ট সিফাতকে নিয়ে খুব বেশি কিছু অাশা ছিলো না। তার শুধু এতটুকু অাশা ছিলো যে, ছোট্ট সিফাত লেখাপড়া করে মানুষের মতো মানুষ হয়ে একটা চাকরি করবে। তারপর বাবাকে শেষজীবনে দেখাশুনা করবে।
হয়তো সম্পূর্ণটা বাস্তবে পরিপূর্ণ হয়েছিলো কিন্তু শেষটাতে অপরিপূর্ণতাই থেকে গেছে।
.
চেয়ারটাতে হেলান দেয়াতে চোখে কিছুটা ঘুম এসেছে। ঘুমের মধ্যে ইমাম সাহেবের দেয়া অাজকের খুৎবাটা ভীষণভাবে মনে পড়ছে। তিনি বলছিলেন,
‘ভাইয়েরা মা-বাবাকে কখনো কষ্ট দিবেন না। কারণ অাখিরাতে জান্নাত লাভের সহজ মাধ্যম হলো এই মা-বাবা।’
তিনি অারো বললেন,
‘বাবার সন্তুষ্টিতে অাল্লাহর সন্তুষ্টি, আর বাবার অসন্তুষ্টিতে অাল্লাহ তায়ালার অসন্তুষ্টি।’
‘একবার রাসূল (সাঃ) ভীষণভাবে রেগে বললেন, ঐ ব্যক্তির নাক ধূলায় ধূসরিত হোক, যে ব্যক্তি তার পিতা-মাতাকে বৃদ্ধাবস্থায় পেল অথচ জান্নাত লাভ করতে পারলো না।’
ইমাম সাহেব এবার একটু সুর দিয়ে বলা শুরু করলেন,
‘ভাইয়েরা অামার, রাসূল (সাঃ) অারো বলেছেন, অাল্লাহ তায়ালার নিকট সবথেকে পছন্দনীয় অামল হচ্ছে পিতা-মাতার খেদমত করা।’
হঠাৎ করে ঘুমটা ভেঙে গেল আমার। পাঞ্জাবীটা ভিজে স্যাঁতস্যাঁতে হয়ে গেছে। জানালার বাইরে এখন মেঘের ঘনঘটা বিলুপ্ত হয়ে রোদ উঠেছে। বৃষ্টি অাসার সম্ভাবনা একেবারে নেই বললেই চলে। বাইরের অালো ভেতরে এসে পড়াতেই ঘরটাকে অালোকিত মনে হচ্ছে।
ইমাম সাহেবের কথানুযায়ী হাতের কাছে জান্নাত পেয়েও হারিয়েছি। বুকের ভিতরটা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। এক গ্লাস পানি পেলে ভালো হতো। কিন্তু কে দেবে তা? ফাতেমা হয়তো দিনরাত খেটে মরছে। তার অার সময় কোথায়!
পানির পিপাসা ভেতরেই রেখে ডায়েরীটার উপরে অারেকবার স্পর্শ করলাম। খুব ইচ্ছে হচ্ছে বাবার ডায়েরীটা খোলার। কিন্তু সাহস কুলাচ্ছে না। কী না কী অাছে এর ভেতর!
একবার এমনটা ভেবে দ্বিতীয়বার ভাবলাম, যাই থাকুক ডায়েরী অামি খুলবোই। আমার বাবার ডায়েরী আমি খুলবো না তো অন্যকেউ খুলবে! এটা শুধু আমারই অধিকার। ডায়েরীটার দিকে তাকিয়ে বাবার বুকশেলফটার দিকে তাকালাম। বাবা কত সুন্দর করে সাজিয়ে রেখেছিলেন বইগুলো। শুধু ডায়েরী নয় বাবার বইগুলোও আমার পড়া উচিত। এখন তো আমিই তার স্থলাভিষিক্ত।
ডায়েরী প্রথম শক্ত অাবরণটা তুললাম। তুলতেই আমার চোখ ছানাবড়া। বাবার পাশে একজন মহিলার ছবি। ছবিটা অস্পষ্ট হলেও বুঝা যাচ্ছে মহিলা দেখতে অনেক সুন্দরী। দু’জনের মাঝখানে ছোট্ট একটা বাচ্চা। নিশ্চয়ই সেটা আমিই, সুন্দরী মহিলা তাহলে আমার মা। বাবা তো প্রায়ই বলতেন, আমি নাকি আমার মায়ের মতো দেখতে সুন্দর হয়েছি। আমার মা দেখতে যেমনি সুন্দর ছিলেন তার থেকে দেখতে কিছুটা অসুন্দর ছিলো বাবা। গ্রামের মানুষেরা নাকি এজন্য বাবাকে ভ্যাংচাতো। এ নিয়ে মায়ের নাকি কোনো অাপসোস ছিলো না। কারণ মা বাবাকে নাকি অনেক বেশিই ভালোবাসতো। আর বাবা মাকে।
.
ডায়েরীর উপরে দেখলাম পৃষ্টা নাম্বারও লেখা অাছে। প্রথম পৃষ্টায় তেমন কিছু পেলাম না। লাল-কালো কলম দিয়ে বাবা সুন্দর করে একটা লাভ অংকন করেছেন। পরের পৃষ্টাটা পুরোটাই ফাঁকা। পরের পৃষ্টাতে দেখলাম,
পৃষ্টা নং:৩
‘অল্প অল্প করে গড়ে তোলা ভালোবাসার সাগরে নতুন করে যোগ হলো কুলসুম। মেয়েটাকে যতই দেখি শুধু মুগ্ধ হয়ে থাকি। ও আমাকে কী দেখে ভালোবেসেছে সেটা আমার ধারণাতীত। আমি কুৎসিত কালো একটা মানুষ। আমার ভাঙা ঘরে এমন জ্যোৎস্নার অালো কি মানাবে? আল্লাহ আমাদের হেদায়াত দান করুক।’
তারপর আর কিছু দেখতে পেলাম না। পরের পৃষ্টা উল্টালাম, নাহ কিছুই নেই। দু’টো পৃষ্টা উল্টানোর পর পেলাম,
পৃষ্টা নং:৬
‘কুলসুম অাজ অাচার খাচ্ছে। কিছুই বুঝতে পারছি না। আমার মুখের দিকে তাকালে কেমন যেমন লজ্জা পাচ্ছে। আমি তাকে তার অজান্তে জড়িয়ে ধরে এর কারণ জিজ্ঞেস করাতে ও যা বললো তা নিজের কানকে বিশ্বাস করাতে পারছিলাম না। আমি নাকি অাব্বা হতে চলেছি। এমন খুশির দিনে কুলসুমকে কোলোয় নিয়ে অানন্দে চারদিক ঘুরেছি। মেয়েটার এখনো লজ্জার রেশ কাটেনি।’
৬নং পৃষ্টাটা পড়ে বুঝলাম বাবা-মাকে কতটা ভালোবাসতো। বাবা স্বল্প শিক্ষিত হলেও ডায়েরীর কথাগুলো যেভাবে লিখেছে তা অনেককটা লেখকদের লেখার ভঙিতে। শুনেছিলাম ক্লাস সেভেনে পড়ার সময় বাবার আব্বা মারা যাওয়াতে তার লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যায়। তারপর শত চেষ্টা করেও সেদিকে ফিরতে পারেনি। সংসার চালানোর জন্য বই ফেলে হাতে তুলে নিয়েছিলো লাঙল কিংবা কাস্তে।
পৃষ্টা নং:৯
‘গ্রামে অাজ এক মণ জিলাপি বিতরণ করেছি। আমার পুত্র সন্তান হয়েছে যে। বাচ্চা, বাচ্চার মা দু’জনেই বেশ ভালো অাছে। আমার সিফাত উল্লাহ দেখতে কালো কুৎসিত হয়নি, ওর মায়ের মতো চকচকে সুন্দর হয়েছে। আমার মতো আমার সন্তানকে কেউ ভ্যাংচাতে পারবে না। আমি খুব খুশি, সৃষ্টিকর্তার দরবারে অজস্র শুকরিয়া।’
পৃষ্টা নং:১২
‘বেশি সুখ নাকি সকলের কপালে সয় না। আমার সিফাতের চার বছর পূরণ হয়েছে গতকাল। আর আজই ওর মাকে একা কবরে রেখে আসলাম। পুতুল খেলার সেই ছোট্ট বধূটি ছাড়া সবকিছুই কেমন যেন ফাঁকা ফাঁকা লাগছে। যখন কথাগুলো লিখছি তখন বিছানায় সিফাত কাঁদছে। সিফাতের দিকে তাকিয়ে দ্বিতীয় বিয়ে করব না বলে শপথ করছি। নিশ্চয়ই আমার সিফাত বড় হয়ে মানুষের মতো মানুষ হয়ে আমার নাম উজ্বল করবে।’
বাবার এ কথাটুকু পড়ে বুক ভরে নিঃশ্বাস নিতে চাইলাম কিন্তু পারলাম না। কেন যেন দমটা বন্ধ হয়ে গেছে। বাবার যোগ্য সন্তান আমি সত্যিকার্থে হয়ে উঠতে পারিনি। আমি কি শেষ বিচারের দিন ক্ষমা পাব?
পৃষ্টা নং:১৬
‘সিফাতের এসএসসি পরীক্ষার ফল বেরিয়ে অাছে। ও খুব ভালো রেজাল্ট করেছে। মাস্টারমশাই বলেছেন সিফাতকে শহরে ভর্তি করাতে। ওর মাঝে নাকি অনেক সম্ভাবনা। কিন্তু আমার তো সামর্থ্য নেই। তবুও আমি হাল ছাড়বো না। ভাবতেছি হালের একটা গরুর বিক্রি করে সিফাতকে ভর্তিসহ অন্যান্য কাজ সমাধা করতে হবে। আচ্ছা সিফাত হোস্টেলের খাবার খেতো পারবে তো? ওতো এখনো আমার হাতে ভাত খায়। বুকটা ভেঙে যাচ্ছে কিন্তু করার কিছুই নেই।’
পৃষ্টা নং: ১৯
‘জানো কুলসুম?
সিফাত চাকরি পেয়েছে। শহরে নতুন বাড়ি ভাড়া নিয়েছে। আমাকেও নাকি তার সাথে থাকতে হবে। আমি কতবার করে বললাম বাপ-দাদার ভিটে ছেড়ে যাব না, কিন্তু কে শোনে কার কথা। আমি ছাড়া নাকি ও শহরে আর যাবেই না। তোমার ছেলের পাগলামি দেখে বড্ড হাসি পাচ্ছে। আর হ্যাঁ, তোমার ছেলে নাকি কোন মেয়েকে পছন্দ করেছে। চাকরিতে জয়েন করার পর বিয়ের কাজটা সমাধা করে দিয়ে আমি নিশ্চিন্ত হতে চাই। আজ তুমি থাকলে কত ভালো হতো।’
বাবার এই পৃষ্টা দু’টো পড়ে চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছে। বাবার এত কথা মনে রেখে এত সুন্দর করে বিষয়গুলো সাজিয়েছে। খুব বেশি কিছু লিখেনি, শুধু মূলকথাগুলোই স্থান পেয়েছে তাতে। পশ্চিম দিকে সূর্য ঢলে পড়েছে। হয়তো কিছুক্ষণের মধ্যে অাযানও দিবে। আমার হাতে সেই ডায়েরী, বাবার ডায়েরী। মনে হয় আরো কয়েকটা পাতা পড়া বাকি রয়ে গেছে।
পরের দু’টো পৃষ্টা উল্টালাম।
পৃষ্টা নং:২২
‘কুলসুম জানো?
এতবড় একলা বাড়িতে না আমার আর থাকতে ইচ্ছে করে না। তোমার কাছে যেতে বড্ড ইচ্ছে করে। কবে দেখা হবে আমাদের দু’জনের? সিফাতটাও বাবা হয়েছে। আগের মতো আমার সাথে কথা বলার সময় পায় না। তিন-চারদিনে একদিন হয় ছেলের মুখটা দেখার ভাগ্য হয়। নাতিটাকে নিয়ে সারাদিন বারান্দায় খেলি। কী করবো বলো, হাজার হোক বউমা এর ভাষায় আমি একজন গ্রাম্য ক্ষ্যাত।’
পৃষ্টা নং:২৫
‘কুলসুম জানো?
আমার সাথে কথা বলার মানুষ নেই বিধায় আমাদের খোকা সিফাত আমাকে বৃদ্ধাশ্রমে রেখে আসতে চেয়েছে। ও বলেছে ওখানে কথা বলার অনেক মানুষ। ভালো ভালো খাবারও পাওয়া যায়। খোকা কালকে সকালেই ব্যাগ গুছিয়ে রাখতে বলেছে। আমার মনে হয় আমার সময় শেষ কুলসুম। তোমাকে খুব কাছে মনে হচ্ছে। খোকাটাও এই হতভাগাটাকেও বুঝলো না।’
তারপর আর কিছু লেখা নেই। পরের পৃষ্টাগুলো ফাঁকাই পড়ে অাছে।
.
ডায়েরীটা বুকের মধ্যে জড়িয়ে ছোট্ট শিশুর মতো হাউমাউ করে কেঁদে উঠলাম। আমার এত বড় সংসারে আমার দুঃখী বাবাটার জন্য একটু থাকার জায়গা জুটাতে আমার কষ্ট হচ্ছিলো তখন। কিন্তু এ ভুল আমার একার কেন? ফাতেমারও। ওহ নাহ! আমি নিজে ভুল করে তার দ্বায় মানুষের ঘাড়ে কেন চাপাতে চাচ্ছি। আমি তার সন্তান হয়ে ঠিক হলে তো কারোরই করার কিছু ছিলো না। আমি সন্তান হিসেবে ব্যর্থ। তাই হয়তো আমার সন্তানও আজ বিপথে।
চোখ দিয়ে অাগের চেয়ে কষ্টের দানাগুলো খুব জোরে প্রবাহিত হতে লাগলো। বাবার ডায়েরীটা বুকে নেয়াতে কষ্ট কিছুটা হালকা হচ্ছে বলে মনে হলো।
ফাতেমার ফের অাওয়াজ শুনলাম, ‘তুমি নামায পড়বে না?’
আমি চেয়ার বসা অবস্থায় আগের মতো ইশারা করে তাকে চলে যেতে বললাম।
একটা স্নিগ্ধ বাতাস জানালা দিয়ে ঢুকে আমাকে নাড়িয়ে দিলো। হয়তো কেউ আমাকে আমার কপালে ছুঁয়ে দিয়ে বলছে, ‘পাগল ছেলে, বড় হয়েছিস না? কাঁদতে নেই তো। বাবারা সবসময়ই নিরবে শুধু দিয়েই যায়, মনে কিছুই রাখে না।’
চমকে উঠলাম। নাহ! এটাও আমার মনের ভুল। চোখ দু’টো বন্ধ করে সেদিনটার কথা ভাবতে লাগলাম, যেদিন বাবাকে বৃদ্ধাশ্রমে রেখে আসতে চেয়েছিলাম। ঘরে ঢুকে সেদিন নামাযরত অবস্থায় নিথর এক মানুষকে দেখেছিলাম শুধু।
বাবা বের হয়েছিলেন, তবে বাবার নিথর কোমল দেহখানা। ফোলা ফোলা চোখ দু’টো চিকচিক করে তখন জ্বলছিলো। হয়তো রাতে অনেক কেঁদেছে।
বাবা হয়তো সেদিন অামার উপর অভিমান করে মায়ের কাছে চিরজীবনের জন্য চলে গিয়েছিলো।
আর আজ আমি যাচ্ছি বাবার অভিমান ভাঙাতে।
(সমাপ্ত)

সম্পর্কিত পোস্ট

পূনর্জন্ম

জুয়াইরিয়া জেসমিন অর্পি . কলেজ থেকে ফিরেই পিঠের ব্যাগটা বিছানায় ছুড়ে ফেললো অন্বেষা। তারপর পড়ার টেবিলের কাছে গিয়ে চেয়ার টেনে নিয়ে ধপ করে বসে দুই হাত দিয়ে মাথাটা চেপে ধরলো।প্রচণ্ড মেজাজ খারাপ ওর। আজ ওদের সেমিস্টার ফাইনালের রেজাল্ট দিয়েছে। একদমই ভালো করেনি সে। যদিও শুরু...

অনুভূতি

অনুভূতি

লেখা: মুন্নি রহমান চারদিকে ফজরের আজানের সুমধুর ধ্বনি ভেসে আসছে। বাইরে এখনো আবছা অন্ধকার। তড়িঘড়ি করে বিছানা ছাড়লো মালা। ঘরের কাজ সেরে বের হতে হবে ফুল কিনতে। তাড়াতাড়ি না গেলে ভালো ফুল পাওয়া যায় না আর ফুল তরতাজা না হলে কেউ কিনতে চায় না। মাথার ওপরে তপ্ত রোদ যেন...

অসাধারণ বাবা

অসাধারণ বাবা

লেখক:সাজেদ আল শাফি বাসায় আসলাম প্রায় চার মাস পর। বাবা অসুস্থ খুব।তা নাহলে হয়তো আরও পরে আসতে হতো।গাড়ি ভাড়া লাগে ছয়শো পঁচিশ টাকা।এই টাকাটা রুমমেটের কাছ থেকে ধার নিয়েছি।তার কাছে এই পর্যন্ত দশ হাজার টাকা ঋণ হয়েছে।বলি চাকরি হলেই দিয়ে দিব। পড়াশোনা শেষ করে দুই বছর...

৪ Comments

  1. Mahbub Alom

    হৃদয় ছোঁয়ার মতো একটা গল্প।জীবনের শেষ উপলদ্ধি গুলো হয় জীবনের করা অসংখ্য ভুল।
    বাবা-মাদের নিয়ে কিছু বলার নেই।তারা সবসময়ই আমাদের শিক্ষক।

    Reply
  2. আফরোজা আক্তার ইতি

    অনেক সুন্দর একটা গল্প লিখেছেন। মন প্রাণ হৃদয় সব ছুঁয়ে গেছে। বাবা আমাদের কতত কষ্ট করে বড় করেন, মাথার ঘাম পায়ে ফেলে আমাদের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য হাজারো কষ্ট করতে থাকেন। কিন্তু তাদের শেষ ঠিকানা হিসেবে জায়গা হয় বৃদ্ধাশ্রমে, যেখানে কিনা তাদের প্রাপ্য আমাদের সঙ্গ, আমাদের স্নেহ,সেখানে তারা পায় একাকীত্ব। আমাদের এই পাপের কি আদৌ কোন ক্ষমা আছে?
    বানানে কিছু ভুল আছে।
    আপসোস- আফসোস।
    পৃষ্টা- পৃষ্ঠা।
    কোলোয়- কোলে।

    Reply
  3. তাহসিন আহমেদ

    দুঃখজনক, খুব দুঃখজনক। আমরা বেঁচে থাকতে কখনোই বাবা-মার মূল্য বুঝতে চেষ্টা করি না। অথচ এটা সবার প্রথমেই বোঝা উচিত। চমৎকার লিখেছেন। মূল ব্যাপারগুলোই সুন্দরভাবে তুলে ধরা হয়েছে। কিপ ইট আপ। শুভকামনা রইলো। আল্লাহ, আমাদের সবাইকে সঠিক বুঝ দান করুক। আমিন।

    Reply
  4. Halima tus sadia

    বাবা বেঁচে থাকতে আমরা বুঝি না।সময় গেলে বুঝি।
    আল্লাহর পরেই বাবা মার স্থান।আর সেই বাবা মাকেই আমরা একসময় ভুলে যাই।বৃদ্ধ বয়সে সংসারে ঝামেলা মনে করে বৃদ্ধাশ্রমে দিয়ে আসি।
    পরে বাবার জন্য কষ্ট পাই।কিছু করার থাকে না।সময় থাকতে বুঝতে পারি না।কিন্তু বাবা নামের মানুষটি ঠিকই নিরবে সব সয়ে যায়।পুত্র যা বলে তাই শুনে।
    কতো কষ্ট করে বাবা মা সন্তানদের লালন পালন করেছেন।আর সেই বাবা মাকেই তুচ্ছ মনে করি।বউয়ের কথা শুনে সন্তানেরা ভুলে যায় বাবার স্নেহ মমতা।

    ভালো লিখেছেন।গল্পের বর্ণনাভঙ্গি ভালো।
    চমৎকারভাবে বর্ণনা করেছেন।
    হ্নদয়স্পর্শী গল্প।

    আপসোস–আফসোস
    কোলেয়–কোলে
    পৃষ্টা–পৃষ্ঠা
    শুভ কামনা রইলো।

    Reply

Submit a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *