আলোর প্রদীপ
প্রকাশিত: অগাস্ট ৮, ২০১৮
লেখকঃ

 77 বার দেখা হয়েছে

এই লেখক এর আরও লেখা পড়ুনঃ

জাকারিয়া আল হোসাইন

প্রায় মধ্য রাত থেকেই মেঘের আনাগোনা। গুড়ুমগুড়ুম মেঘের ডাকে ঘুম ভাঙ্গে কিশোর তালহার। আবারও ঘুমানোর চেষ্টা করে সে। অষ্টম শ্রেণীর ছাত্র তালহা। সে নিয়মিত সালাত আদায় করে। বিছানায় এপাশ-ওপাশ করতে করতেই ভেসে এলো পাশের মসজিদ থেকে মুয়াজ্জিনের সুললিত কণ্ঠে সালাতুল ফজরের আজান। ভেসে এলো ‘আস্সালাতু খাইরুম মিনানা নাউম’। তার আর ঘুমানোর সুযোগ হলো না। বিছানা ত্যাগ করে প্রস্তুতি নিলো সালাত আদায়ের।
অযু সেরে সালাত আদায়ের জন্য জায়নামাজে দাড়ালো সে। কিশোর তালহা প্রতিদিনের মত সালাত শেষ করে কুরআন তেলাওয়াতে মন দিলো। তবে আজ সে সুরা ইনফিতার থেকে তেলাওয়াত করছে।
সুরার মাঝখানের দুইটি আয়াত ‘ হে মানুষ, কোন জিনিসে তোমাদের ধোকায় ফেলেছে; সেই মহান সৃষ্টিকর্তার ইবাদত থেকে। যিনি তোমাদের সৃষ্টি করছেন খুব সুন্দর করে’। এই আয়াতদ্বয়ের ভাবার্থ খুঁজতে থাকে সে। একান্ত নিরব হয়ে ভাবতে থাকে। ভাবনার সাগরে সাঁতরে বেড়ায় কিছুক্ষণ। প্রান্তসীমায় পৌঁছতে না পৌঁছতেই চোখ পড়ে জানালার বাইরে। পূর্বাকাশে লাল রক্তিম আভায় সূর্য্য জেগে ওঠার জানান দিচ্ছে। কিচিরমিচির হাঁক ছাড়ছে ঝোপের পাখিগুলো.
চারিদিকের সবুজ প্রকৃতিও আপন করে তাদের পাখনা মেলে ধরছে। হঠাৎ তালহার চোখ পড়লো সবুজ সতেজ নরম ঘাসের শিশির বিন্দুর উপর। সেখানে একটি হলুদ ও লালচে বর্ণের প্রজাপতি খেলা করছে।
ওর মন চলে যায় প্রজাপতির কাছে। পড়ে যায় প্রজাপতির প্রেমে। প্রজাপতিকে নিয়ে তৈরি হয় আরেক কৌতুহল। ভাবনার আরেকটি জগৎ সৃষ্টি হয় তালহার কোমল হৃদয়ে। এবার কুরআনের পাতাগুলো বন্ধ করে সে। তারপর ভাবতে থাকে আল্লাহর সুন্দর সৃষ্টি নিয়ে। ভাবতে থাকে প্রজাপতির রূপ আর সৌন্দর্য নিয়ে। ভাবতে থাকে কত সুন্দর আকৃতিতে প্রজাপতিকে সৃষ্টি করেছেন আল্লাহ্ তায়ালা। পাশাপাশি ফুল, পাখি, নদী, পাহাড় কতই না সুন্দর। তাহলে আশরাফুল মাখলুকাত হিসেবে আমরা মানুষ কত সুন্দর। আল্লাহ্ আকবার’ অজান্তেই তার মুখ থেকে বেড়িয়ে আসে এমন ধ্বনি। তার মন ফিরে যায় সুরা ইনফিতারে সেই প্রাঞ্জল আয়াতের দিকে। তালহা ভাবে প্রজাপতির কোন পাপ নেই। পাখিরা কখনো গুনাহের কাজ করে না। ফুলেরা শুধু সুবাস ই ছড়ায় আর ভালোবাসা বিলায়। বৃক্ষলতা আমাদের হাজারও উপকারে আসে।ইত্যাদি নিদর্শনে ভরা আল্লাহর সৃষ্টি। অথচ আমরা তাদের অনেক ক্ষতি করি। তাদের উপর চালাই অসংখ্য অত্যাচার। তাদের পাতা ছিড়ে, ফুল ছিড়ে, কতই না কষ্ট দেই। তারাতো কোনদিন আমাদের সাথে ঝগড়া বিবাদে লিপ্ত হয় না। আমাদের সাথে মারামারি করে না। এমনকি নিজেরাও। এরকম নানান ভাবনায় মত্ত হয়ে পড়ে তালহার কচি হৃদয়টি।
তালহা আরোও ভাবতে থাকে যে, আমরা কেন মানুষে মানুষে ঝগড়া করি, আমরা কেন একে অপরের অনিষ্ট করতে উঠে পড়ে লাগি! আমরা কেন দেশ ও জাতির কল্যাণে কাজ করি না, কেন পাশে দাঁড়াই না দুঃখিজনের।
এভাবে ভাবনার নোনাজলে ভাসতে থাকে আরো কিছুটা সময়। কোন কূল কিনারা খুঁজে পায় না সে।
হঠাৎ মায়ের আদর মাখা ডাক। তালহা, নাস্তা রেডি হয়েছে। তোমার আব্বু অপেক্ষা করছে তোমার জন্য। তারাতারি এসো, তোমার আব্বু অফিসে যাবে।
ততক্ষণে প্রায় ৮টা বেঁজে গেছে। তালহা দ্রুত টেবিলে এলো। আস্সালামু আলাইকুম আব্বু। গুড মরনিং……
খাওয়া শেষ করে আব্বু অফিসে গেলো। এদিকে তালহাও প্রস্তুতি নিলো স্কুলে যাওয়ার।
তালহাদের বাড়িটা ছিলো শহরের পাশেই। একটু গ্রাম টাইপের। কাঁচা রাস্তা দিয়ে স্কুলে যেতে হয় তাকে। রাতে বৃষ্টির ফলে রাস্তা কর্দমাক্ত হয়ে পড়েছে। পিচ্ছিলও হয়েছে বেশ। নিরাপদে হেটে চলাও কষ্টকর। কিন্তু তালহা স্কুলের নিয়মিত ছাত্র। তাকে স্কুলে যেতেই হবে। তাই পায়ে হেটেই স্কুলের উদ্দেশ্যে বের হলো তালহা।
আপন মনে হেটে চলছে সে। হঠাৎ ওর চোখে দেখা মিললো প্রায় ওর বয়সী এক কিশোরের। গায়ে কোন ভালো জামা নেই। পায়ে নেই স্যান্ডেল। চেহারায় অসহায়ত্ত্বের কালো ছাপ। দেখেই মনে হচ্ছে, কতদিন পেটপুরে খাবার পায় নি সে। তালহা ছেলেটিকে কাছে ডাকে। অপন করে জানতে চায়, তোমার নাম কি?
– সোহাগ।
– বাড়ি কোথায়?
– ঐ গাঁয়ের মুন্সিপাড়ায়।
– কি কর তুমি?
– অন্যের বাড়িতে কাজ কইরা খাই।
– তোমার বাবা মা নেই?
– আছে, কিন্তু মা নেই।
– বাবা কি করে?
– অন্যের বাড়িতে কাজ করে।
– তোমার আর কে কে আছে?
– ছোট্ট বোন আর একটা ছোট্ট ভাই।
– তুমি পড়তে যাও না?
– ক্যামনে যাবো। সারাদিনতো কাজ করি।
– তোমার বাবা থাকতে তুমি কেন কাজ করো?
– বাবার কাজে পরিবার চলে না। তাই আমাকেও করা লাগে।
– পড়তে মন চায় না?
– অবশ্যই মন চায়। কিন্তু দারিদ্রতা এর মূল কারণ। আমি পিএসসিতে (এ+) পাইছিলাম।
ছেলেটার কথা শুনে মনে হচ্ছে সেই সত্তিই অনেক মেধাবী। ওকে যদি বাসায় নিয়ে যাই। একসাথে পড়ালেখা ও খেলাধুলা হবে। মা আর আব্বুও খুশি হবেন নিশ্চয়। এমনটি ভাবতে থাকে তালহ।
– তুমি কি আমার সাথে থাকবে?
– ক্যামনে। তোমার সাথে থাকলে ছোট্ট ভাইবোনরা কি খাবে, কোথায় ঘুমাবে, কে দেখবে ওদের।
– আমি তোমার বাবাকে বুঝিয়ে বলবো।তুমি অনেক বড় হবে, অনেক কিছু শিখবে, তোমাকে আর কষ্ট করতে হবে না।
– না, যামু না।
তাকে নিয়ে তালহা যায় তার বাবার কাছে। সোহাগের বাবাকে বুঝিয়ে বলে মনের আবেক আর অনুভূতির কথাগুলো। তালহা বুঝিয়ে বলে সোহাগের ভবিষ্যতের কথা। একপর্যায়ে সোহাগের বাবা রাজি হলো।
সোহাগ এখন তালহাদের বাসায় পড়ালেখা করছে। আগের থেকে অনেক পরিপাটি আর সচেতন হয়েছে সে। তাঁকে দেখে আর মনে হয় না যে সে গরবী পরিবারের কেউ। তার কথা, কাজ, চলন সবকিছুতেই পরিবর্তন। পড়ালেখাও বেশ দূরন্ত। মাধ্যমিক এবং কলেজ জীবন শেষ করে সে এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। সে এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের একমাত্র মেধাবী ছাত্র সোহাগ।এই বছর সে মাস্টার্স ফাইনাল পরীক্ষা শেষ কর ফলপ্রার্থী হয়ে গ্রামে ফিরেছে।
জীবনের মোড় ঘুরিয়ে সোহাগ এখন একজন শিক্ষিত যুবক। বাবার জীবন প্রদীপ। এলাকার দ্বীপ্তশিখা। ভাই বোনদের আলোর আশা। সমাজের জন্য আলোর বাতি। সে এখন আর দেশ ও জাতির কাছে বোঝা নয়। অবশেষে বের হলো মাস্টার্স পরীক্ষার রেজাল্ট। ভালো ফলাফল অর্জন করলো সে। সময়ের পরিক্রমায় সে হয়ে গেছে প্রাইমারী স্কুলে প্রধান শিক্ষক। সে এখন অনেক স্বাবলম্বী।
পাড়ার সকল অসহায় ও দারিদ্র ছাত্র ছাত্রীকে বিনামূল্যে পাঠ দান করছেন সোহাগ। এখন তার একটাই প্রত্যয়, যে করেই হউক আমার এই গ্রামকে শিক্ষার আলোয় আলোকিত করতে হবে। দেশ ও জাতির কল্যাণে কাজ করতে হবে। এলাকার অসহায় শিশু কিশোরদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল এখন সোহাগ। যেন ‘আলোর প্রদীপ’।
তালহার অবদানের কথা স্বরণ রেখে সামনের পথে এগিয়ে চলার প্রত্যয়ে সচল ভুমিকা রাখে সোহাগ। দেশ ও জাতির কল্যাণে জড়িয়ে পড়ে তারা দুজনে। তাদের প্রচেষ্ঠায় মুন্সিপাড়া এখন একটি মডেল এলাকায় পরিনত হয়েছে। এখানে জন্মগ্রহন করছেন অনেক গুনিজন। অনেক শিক্ষিতজনের আবাসস্থল এখন মুন্সপাড়া। গর্বিত সোহাগের গ্রাম। গর্বিত তালহার জনভূমি। এমন অসংখ্য তালহার জন্ম হউক সারা বিশ্বে। ছড়িয়ে পড়ুক গ্রামে গ্রামে। এমন কি প্রতিটি পরিবারে।

সম্পর্কিত পোস্ট

পূনর্জন্ম

জুয়াইরিয়া জেসমিন অর্পি . কলেজ থেকে ফিরেই পিঠের ব্যাগটা বিছানায় ছুড়ে ফেললো অন্বেষা। তারপর পড়ার টেবিলের কাছে গিয়ে চেয়ার টেনে নিয়ে ধপ করে বসে দুই হাত দিয়ে মাথাটা চেপে ধরলো।প্রচণ্ড মেজাজ খারাপ ওর। আজ ওদের সেমিস্টার ফাইনালের রেজাল্ট দিয়েছে। একদমই ভালো করেনি সে। যদিও শুরু...

অনুভূতি

অনুভূতি

লেখা: মুন্নি রহমান চারদিকে ফজরের আজানের সুমধুর ধ্বনি ভেসে আসছে। বাইরে এখনো আবছা অন্ধকার। তড়িঘড়ি করে বিছানা ছাড়লো মালা। ঘরের কাজ সেরে বের হতে হবে ফুল কিনতে। তাড়াতাড়ি না গেলে ভালো ফুল পাওয়া যায় না আর ফুল তরতাজা না হলে কেউ কিনতে চায় না। মাথার ওপরে তপ্ত রোদ যেন...

অসাধারণ বাবা

অসাধারণ বাবা

লেখক:সাজেদ আল শাফি বাসায় আসলাম প্রায় চার মাস পর। বাবা অসুস্থ খুব।তা নাহলে হয়তো আরও পরে আসতে হতো।গাড়ি ভাড়া লাগে ছয়শো পঁচিশ টাকা।এই টাকাটা রুমমেটের কাছ থেকে ধার নিয়েছি।তার কাছে এই পর্যন্ত দশ হাজার টাকা ঋণ হয়েছে।বলি চাকরি হলেই দিয়ে দিব। পড়াশোনা শেষ করে দুই বছর...

৪ Comments

  1. Halima Tus Sadia

    ভালো লিখেছেন।
    সোহাগের মতো তরুণ ছেলেরা এলাকার গর্বের মানুষ।জীবনে সফলতা এসেছে।

    তালহার কারণেই সোহাগ এতো দূর পর্যন্ত যেতে পেরেছে।তালহার মতো যদি সবাই এরকম হতো তাহলে দেশে গরীব মেধাবী ছাত্র আর পড়াশোনা ছাড়া থাকলোন না।
    বানানে ভুল আছে।

    শ্রেণীর–শ্রেণির

    সুললিত কণ্ঠে–সুমধুর কণ্ঠে

    দাড়ালো–দাঁড়ালো

    অপন–আপন

    গরবী–গরীব

    মুন্সপাড়া–মুন্সিপাড়া

    তারাতারি–তাড়াতাড়ি

    পায় নি—পায়নি

    ধোকায়–ধোঁকায়

    মিনানা নাউম—মিনান নাউম
    শুভ কামনা।

    Reply
  2. আফরোজা আক্তার ইতি

    খুব সুন্দর লিখেছেন। তালহার সাহায্যের জন্য সোহাগের মত ছেলেরা স্বাবলম্বী হতে পারছে। আমাদের সবারই উচিৎ তালহার মত মনোভাব পোষণ করা, তাহলে সোহাগের মত আমাদের সমাজের অনেক ছেলেই নিজের পায়ে নিজে দাঁড়াতে পারবে। বানানে ভুল আছে।
    ধোকা- ধোঁকা।
    সূর্য্য- সূর্য।
    কিচিরমিচির হাঁক হবে না, কিচিরমিচির কলরব হবে।
    তারাতারি- তাড়াতাড়ি।
    বেঁজে- বেজে।
    হেটে- হেঁটে।
    আবেক- আবেগ।
    এগিয়ে যান। শুভ কামনা।

    Reply
  3. Anamika Rimjhim

    তাঁকে-তাকে
    গরবী-গরীব
    শ্রেণীর -শ্রেণির
    দারিদ্র-দরিদ্র
    দাড়ালো- দাঁড়ালো
    হউক -হোক
    মুন্স-মুন্সি
    জনভূমি-জন্মভূমি
    অপন-আপন।
    তারাতারি -তাড়াতাড়ি
    পরিনত-পরিণত
    বেঁজে-বেজে
    …….ইত্যাদি।
    লেখার প্রতি একটু যত্নবান হোন। 🙂
    আর আমার তেমন বাস্তব লাগেনি গল্পটা। এরকম হয়না। যদি কখনো হয় তাহলে হয়ত দেশটাই বদলে যাবে 🙂
    শুভ কামনা।

    Reply
  4. Mahbub Alom

    দারুণ হয়েছে।একটি শিক্ষামূলক গল্প।
    আমাদের দেশের প্রতি স্তরে স্তরে তালহার মতো একজন কিশোর প্রয়োজন।প্রয়োজন সোহাগের মতো মেধাবী ছেলের প্রতি একটু সহানুভূতি।তাহলেই আমাদের দেশ উন্নত হবে।একটি শিক্ষিত জাতি গঠন হবে।

    বানানে কিছু ভুল আছে।তবে পরেরবারের জন্য শুভকামনা রইলো

    Reply

Submit a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *