দু শব্দের চিঠি
প্রকাশিত: জানুয়ারী ১৫, ২০১৮
লেখকঃ vickycherry05

 77 বার দেখা হয়েছে

এই লেখক এর আরও লেখা পড়ুনঃ vickycherry05

গল্প লেখকঃ
#রোকসানা_রশিদ_লিলি
………………

আমি কালো মেয়ে। কুশ্রী। সুনয়ননাও নই। তবুও নাম আমার সুনয়ননা। লোকে সু বলেই ডাকে। সুনয়ননা বলতে তাদের রুচিতে বাধে। বাধবারই কথা,পিটপিটে বেড়াল চোখী কোন মেয়েকে সুনয়ননা ডাকা যায় নাকি? বনলতা উপমাটাও ঠিক যায় না। লালচে বাদামী কতগুলো কোকড়ানো চুল আমার! আজ রাঙ্গা পিসি এসেছে বাড়িতে। আমার জন্মের পর তার এই প্রথম আসা। সাথে ডাক্তারী পড়ুয়া ছেলেও আছে। এরা মূলত কলকাতায় থাকে। তাদের এগিয়ে আনতে আমি নিচে গেলাম। আমাকে দেখেই পিসির প্রথম প্রশ্ন “তুই কে রে?” আমি কিছুটা থতমত খেয়ে গেছিলাম। কিছু বলার আগেই তার ঝোলাগুলো আমাকে ধরিয়ে দিলো। “হা করে কি দেখছিস? কানে কথা যাচ্ছে না? ভালো করে ধর। এগুলোর দাম জানিস? তোকে দশবার বেচলেও এর দাম হবে না।বুঝলি?” চোখ থেকে পানি গড়িয়ে পড়ার চেষ্টা করছিলো। কোনোরকমে দাতে দাত চেপে রইলাম। বাড়িতে ঢুকতেই এদের খোসগল্প শুরু হল। আমার পিসতুতো ভাইকে দেখছিলাম বারবার এদিক ওদিক তাকাতে। যেন কাউকে খুব খুচ্ছে। কথার এক পর্যায় পিসি মাকে বলল “হ্যা রে বিনু তোদের বুঝি বেশ কাচা পয়সা হয়েছে। বাড়ির কাজের মেয়েদের গায়েও দামী কাপড় চড়িয়ে বেড়াচ্ছিস”। “তুমি কাজের মেয়ে কোথায় পেলে?”। “এমা তবে এ মেয়েটা?” পিসি প্রশ্ন বৈঠকঘরে একটা নিরবতা বয়ে গেল। সবাই সবার মুখের দিকে তাকাচ্ছে। বাবার চোখে মুখে একটা চাপা আতঙ্ক। মা অসহায়ের মত আমার দিকে চেয়ে আছে।উত্তরটা আমিই দিলাম। আমি সু। সুনয়ননা ঘোষ। পিসি সবে চা টায় চুমুক দিয়েছিলো। চা টা বুঝি মুখ চুইয়ে পড়েই যাবে। তীক্ষ্ম দৃষ্টিতে আমার ব্রণ ভর্তি খাদ হয়ে যাওয়া এবড়ো-থেবড়ো গালগুলোর সঙ্গে আমার ছোট দু বোনের আলতা রাঙ্গা গালগুলো মিলিয়ে নিলেন। তারপর জোড় করে একটা হাসি দিয়ে বললেন। “ও তাই বল তুই আমাদের সু?” নিলয় দা সরাসরি আমার দিকে তাকিয়ে আছেন। চোখের পলক পড়ছে না। এতক্ষণের খোজাখুজিটাও থেমেছে। যাকে খুচ্ছিলেন বোধ করি তাকে পেয়ে গেছেন।ভাবছি তারা যতদিন বাড়িতে থাকবেন ততদিন আমি ঘর থেকে বেরুব না। শুনেছিলাম আমার জন্মের খবর পেয়ে নাকি আমার এই পিসি বাবার কাছে আবদার করেছিলো তার ছেলের সাথে আমার বিয়ে দিতে হবে। এখন নিজেকে খুব ছোট মনে হচ্ছে। খুব।আগেও হতো। ক্লাসের সবচেয়ে কুসচিৎ মেয়ে বলে আমার সাথে কোন ছেলে কথা বলত না। যাও দু একজন বলতো তাও ছিলো পরীক্ষায় দু কলম দেখে লেখা বা নোট-পত্র হাতানোর ধান্দা। এই দুটো দিন রবীন্দ্র শরৎ পড়ে ভালই কেটেছে। সুলেখা আর সুজাতা প্রতিবেলায় খাবারটা দিয়ে যেত। সাথে নিলয়দা ওদের কিসব মজার মজার গল্প শোনালো তাও বলতো। ওদের জন্য নাকি অনেক উপহারও এনেছে। সেদিন হঠাৎ দরজায় আলতো করে একটা টোকা পড়লো। সাথে গলা ঝাড়ার একটা শব্দ। বুঝলাম নিলয় দা। -ইচ্ছে হলে আসতে পারেন। -কেন আমি আসি তুই সেটা চাস নি? [নিলয় দা ঢুকতেই মিষ্টি একটা গন্ধ নাকে লাগলো।চওড়া নাক,গোলাপী ঠৌট, মুক্তোর মত ঝকঝকে দাত।তার হাসিতে আমি যেন ঝলসে যাচ্ছিলাম।] -না ঠিক তা নয়। -তাহলে ঠিক টা কি? আচ্ছা বাদ দে। তা তুই ঘর থেকে বেরুচ্ছিস না যে? -আমি এমনই। -না তুই এমন না। -আমি কেমন সেটা আপনার জানার কথা না। -কিন্তু আমি জানি। সুলেখা আর সুজাতা আমায় বলেছে। আচ্ছা এখন লক্ষ্মী মেয়ের মত আমার সাথে চলতো। ক্যারাম খেলবি। তুই নাকি ভাল ক্যারাম খেলিস। আমি কিছুটা অবাক হচ্ছিলাম তার হুকুম করার ভাবখানা দেখে।তবুও মনের কোথায় যেন একটা চাপা ভালো লাগা কাছ করছে। যেন আমি এটাই চাচ্ছিলাম। বাগানে গিয়ে দেখি সুজাতা সুলেখা ক্যরাম নিয়ে তৈরি। ধীরে ধীরে আমি কোথায় যেনো হারিয়ে যাচ্ছি। খোলস ছেড়ে বেরুচ্ছি। হাসি আড্ডায় যেন নিজেকে ফিরে পেলাম। এর মধ্যে বিতর্ক শুরু হলো এপার বাঙলা আর ওপার বাঙলা নিয়ে। কোন বাঙলা ইতিহাস-ঐতিহ্যে বেশী সমৃদ্ধ সেটাই বিষয়। এপার বাঙলার দলে আমরা তিন বোন। আর ওপার বাঙলার দলে শুধু নিলয় দা। সে যেন একাই একশ। জল খাবারের ডাক এলে বিতর্ক মূলতবি ঘোষণা হল। খাবার টেবিলে নিলয় দা সব চেয়ারগুলো ফেলে আমার পাশে বসল। পিসিকে দেখলাম আড়চোখে নিলয় দা বারবার সরে আসতে বলছেন। কিন্তু নিলয় দা মুখ শক্ত করে বসে রইলো। কথা বার্তা শুনে বুঝলাম কাল পিসিরা ছোট কাকুদের বাড়ি যাবে। সেখান থেকে সোজা কলকাতা। বাবা আর কটা দিন থাকার জন্য সাধাসাধি করছিলো। হঠাৎ নিলয় দা বলে উঠল “আমি যাচ্ছি না। আমি আরো কিছুদিন থাকবো। যেতো হলো তুমি একা গিয়ে ছোট কাকুর বাড়ি ঘুরে এসো। “পিসির চোখগুলো যেনো ধপ করে জ্বলে উঠল “আমি একা যাবো মানে? তুই এখানে থেকে কি করবি? আর আমি এ শরীর নিয়ে একা যাবো কি করে?” উত্তরে নিলয় দা বলল “কেন বড় কাকু যাবে তোমার সাথে।” পুরো সময় পিসি নিলয় দাকে বোঝানোর চেষ্টা করলেন। কিন্তু নিলয় দা সাফ সাফ জানিয়ে দিল সে যাচ্ছে না। খেতে খেতে হঠ্যাৎ আবিষ্কার করলাম আমার প্লেটে মাছের পেটিটা নেই। কি ভুতড়ে ব্যাপার রে বাবা। পাশে চেয়ে দেখি নিলয় দা মুখ টিপে টিপে হাসছে আর আমার পেটিটা আমাকে দেখিয়ে দেখিয়ে চিবুচ্ছে। হাত ধোবার সময় ফিসফিসিয়ে বললাম -মাছের পেটিটা চুরি করে ভালো করলে না। -কেন কি করবি তুই? – তোমার পেটিটা আর আস্ত থাকবে না। -দেখবো তোর দাঁতে কত জোড়। রাতের ঘুমটা ভাল ছিল সকালে দেখি পিসিও নেই বাবাও নেই। তসলিমা নাসরিনে বইয়ের একটা লাইন মনে পড়ছে “যম গেছে যমের বাড়ি আমরা এখন স্বাধীন নারী।” সুজাতা আর সুলেখাকে নিয়ে নিলয় দার ঘরে হানা দিলাম। লাট সাহেব দিব্যি ঘুমুচ্ছে। মনের মত কাজল পরিয়ে দিলাম। ঠৌটে লিপস্টিক ঘসে সে এক যাতা অবস্থা। বেলা এগারটা অব্দ্যি রান্না ঘরে এসে চোখ কচলিয়ে মাকে বলল কাকী আজ আমায় ডাকলে না যে। মার মুখ দিয়ে আর শব্দ বেরুলো না মা তো হেসেই খুন। নিজেকে আয়নাতে দেখে ষাড়ের মত ছুটতে ছুটতে বাগানে দিকে এলো। তিন বোনে মিলে সারা বাড়ি দৌড়েও আর শেষ রক্ষে হলো না। -এসব কি করেছিস? -এমা! ভুলে গেলে?কেনো তোমার পেটিটা চিবিয়ে খেলাম! -তবে রে……. দিন তিনেক না গড়াতেই দেখি দুপুরে পিসি হাজির। সোজা গিয়ে নিলয় দার ঘরে ঢুকলো। কি যেন নিয়ে তুমুল কথা কাটাকাটি হচ্ছিলো। প্রতিজ্ঞা,উচিত-অনুচিত এসব নিয়ে কথা হচ্ছিলো। ভাসা ভাসা কিছু কথা আমি শুনছিলাম- -আমি প্রতিজ্ঞা করেছিলাম সুতরাং সেটা আমিই ভাববো। এসব তোকে ভাবতে হবে না। -হবে কারণ আমি সুনয়ননাকে ভালোবাসি। -দুদিনেই প্রেমে পড়ে গেলি? -দু দিন নয় বলো দু দশক! -মানে? -মনে আছে ওর সাথে বিয়ে দেবে বলে তুমি তোমার বান্ধবীদের সাথে গল্প করতে। সেই তখন থেকে আমি ওকে আমার মত ভেবেছি। মনে মনে ছবি একেঁছি। -নিশ্চয়ই তোমায় মনে এরকম কুশ্রী নারীর ছবি ছিলো না?-একটা পরিপূর্ন নারীর ছবি ছিলো। কোন কুশ্রী বা সুশ্রীর ছবি ছিলো না। সেদিন রাতে কেউ ঘুমায় নি। পাশের ঘর থেকে সুলেখা সুজাতার ফিসফিস কথার আওয়াজ শুনছিলাম। মা বাবার ঘরের বাতিটা বারবার জ্বলছে নিভছে। বাগান ধরে নিলয়দা হাটার শব্দ শুনছিলাম। সে বোধয় কয়েকবার আমার জানালার কাছে এসে দাড়িয়েছে কিন্তু ডাকার সাহস জোগাড় করতে পারে নি। বিছানায় বালিশটা ভিজে উঠছিলো। কখন ঘুমিয়ে পড়েছিলাম জানি না। সকালে উঠে দেখি সুজাতা সুলেখা মুখ হাড়ি করে বসে আছে। বাড়িতে সুনশান নিরবতা। যেন কেউ মরে গেছে। আয়নার সামনে দাড়ালাম। নিজেকে অচেনা লাগছে। আমার কখনো বিয়ে হবে না আমি জানতাম কিন্তু আমার জন্য বাবা মা কে এতটা হেনাস্তা হতে হবে ভাবতে পারি নি। এরা দুজন কেমন যেন চুপসে গেছে। যেন এটা ঘটবে তারা আগেই জানত। শরিরটা খুব ভারী ভারী লাগছে। শোবার ঘরের টেবিলে কি যেন এক কাগজ রাখা। আস্তে আস্তে খুললাম। গুটি গুটি অক্ষরে লেখা দু শব্দের চিঠি “আমি ফিরব” ●●●●●●●●●●●●●●●●●●●● গত বিশ বছর ধরে আমি তার ফেরার অপেক্ষায় আছি। পাচঁ বছর আগে শুনেছি পিসি মারা গেছেন। পিসি নিলয় দা কে বিয়ের জন্য অনেক কাকুতি-মিনতি করেছিল। কিন্তু শোনে নি। আমার বাবাও গত হয়েছেন বারো বছর হলো। বাবা মারা যাবার পর সংসারটার হাল আমিই ধরেছি। সুলেখাকে বিয়ে দিয়েছি। সুজাতা স্কলারশিপ নিয়ে বিদেশে গেছে পড়তে। আজ মাকে দেখলাম বেশ খুশি খুশি। রান্নাঘর থেকে মিষ্টি পায়েসের গন্ধ ভেসে আসছে। আজ বহু বছর পর একটু কাজল চোখের নিচে লেপ্টে দিলাম। কলিংবেলটা বাজছে……

সম্পর্কিত পোস্ট

পূনর্জন্ম

জুয়াইরিয়া জেসমিন অর্পি . কলেজ থেকে ফিরেই পিঠের ব্যাগটা বিছানায় ছুড়ে ফেললো অন্বেষা। তারপর পড়ার টেবিলের কাছে গিয়ে চেয়ার টেনে নিয়ে ধপ করে বসে দুই হাত দিয়ে মাথাটা চেপে ধরলো।প্রচণ্ড মেজাজ খারাপ ওর। আজ ওদের সেমিস্টার ফাইনালের রেজাল্ট দিয়েছে। একদমই ভালো করেনি সে। যদিও শুরু...

অনুভূতি

অনুভূতি

লেখা: মুন্নি রহমান চারদিকে ফজরের আজানের সুমধুর ধ্বনি ভেসে আসছে। বাইরে এখনো আবছা অন্ধকার। তড়িঘড়ি করে বিছানা ছাড়লো মালা। ঘরের কাজ সেরে বের হতে হবে ফুল কিনতে। তাড়াতাড়ি না গেলে ভালো ফুল পাওয়া যায় না আর ফুল তরতাজা না হলে কেউ কিনতে চায় না। মাথার ওপরে তপ্ত রোদ যেন...

অসাধারণ বাবা

অসাধারণ বাবা

লেখক:সাজেদ আল শাফি বাসায় আসলাম প্রায় চার মাস পর। বাবা অসুস্থ খুব।তা নাহলে হয়তো আরও পরে আসতে হতো।গাড়ি ভাড়া লাগে ছয়শো পঁচিশ টাকা।এই টাকাটা রুমমেটের কাছ থেকে ধার নিয়েছি।তার কাছে এই পর্যন্ত দশ হাজার টাকা ঋণ হয়েছে।বলি চাকরি হলেই দিয়ে দিব। পড়াশোনা শেষ করে দুই বছর...

০ Comments

Submit a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *